ইসরায়েলের সঙ্গে লেবাননের ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর শুক্রবার হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেয় ইরান। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের শান্তি প্রক্রিয়া ও যুদ্ধবিরতি যতদিন বলবৎ থাকবে ততদিন হরমুজ দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতে পারবে। ইরানের এই ঘোষণার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার ট্রুথ সোশ্যালে একাধিক বার্তায় হরমুজ খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ইরানকে ধন্যবাদ জানান। ট্রাম্প আশাবাদ প্রকাশ করেন আর কখনওই ইরান হরমুজকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে না।
একইসঙ্গে চূড়ান্ত শান্তি প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ইরানের নৌবন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ বলবৎ থাকবে বলে জানান ট্রাম্প। ট্রাম্পের এই অনড় অবস্থানের ফলে ইরানও হরমুজ ইস্যুতে সিদ্ধান্ত বদলেছে। শনিবার আবার হরমুজকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। হরমুজ নিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই সাপ-লুডু খেলা কিছুতেই কমছে না। রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে ইরানের কাছে হরমুজ হলো তুরুপের তাস।
হরমুজ ফের অবরুদ্ধ করার বিষয়ে তেহরানের ঘোষণার পর স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং সাইটগুলোতে দেখা যায়, পারস্য উপসাগর থেকে বের হতে যাওয়া বেশ কিছু তেলবাহী ট্যাঙ্কার ও বাণিজ্যিক জাহাজ মাঝপথ থেকে ফিরে যাচ্ছে।
তবে শুক্রবার হরমুজ দিয়ে বেশ কয়েকটি জাহাজের পারাপারের অনুমোদন পেলেও তা মূলত একটি ‘শুভেচ্ছা নিদর্শন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে আইআরজিসি। ইরান মূলত সেসব জাহাজকেই চলাচলের অনুমতি দিয়েছে যারা তাদের প্রতিপক্ষ কোনো শক্তির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। তবে ভারত ও চীনের কয়েকটি জাহাজকে হরমুজ অতিক্রম করার অনুমতি দিলেও তাদের গতিবিধি ছিল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকেই হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে এক মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলছে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে ইরান এই প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ করে এ পথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে মধ্যস্থতাকারীদের প্রচেষ্টায় এবং একটি সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে শুক্রবার ইরান ‘শুভেচ্ছা নিদর্শন’ হিসেবে কিছু জাহাজকে পার হওয়ার অনুমতি দেয়।
মার্কিন নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকার প্রতিবাদে শনিবার তেহরান আবারও প্রণালিটির ওপর ‘কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণ’ আরোপের ঘোষণা দেয়। তেহরানের অভিযোগ, ওয়াশিংটন অবরোধ বহাল রেখে তাদের বিশ্বাসের মর্যাদা দেয়নি।
সম্প্রতি আইআরজিসি কর্তৃক প্রকাশিত একটি মানচিত্রে দেখা গেছে, ওমান সংলগ্ন দক্ষিণ দিকের জলসীমাকে ইরান ‘ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং নিজেদের উপকূলীয় অংশকে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই মানচিত্রের মাধ্যমে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালির ওপর আগের চেয়ে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে টোল বা মাশুল আদায়ের বিষয়টিও এখন আলোচনায়। ইরানের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরিকল্পিত এই মাশুল থেকে অর্জিত অর্থ তাদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষতিপূরণ হিসেবে ব্যবহার করা হবে। ইরান বিষয়টিকে কেবল একটি বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছে না দেখে বরং একে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ আদায়ের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখছে।
গত সপ্তাহে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দেশটির রাজধানী ইসলামবাদে শান্তি আলোচনায় বসে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা। একুশ ঘণ্টার ওই ম্যারাথন আলোচনায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র বেশকিছু শর্ত উপস্থাপন করলেও কোনো সমঝোতা ছাড়াই দুই দেশের আলোচনা শেষ হয়। ইরান জানায়, দেশটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধ করবে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত ছিল ইরানকে ইউরেনিয়াম কর্মসূচি প্রত্যাহার করে সব ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে হবে। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা আলোচনার পথকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে তা অনিশ্চিত। এই অনিশ্চয়তাই এখন বিশ্ব রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান হরমুজ প্রণালীকে উত্তপ্ত পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই অস্থিতিশীল পরিবেশে অদূর ভবিষ্যতে কোনো টেকসই সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে রয়েছে গভীর সংশয়।