বিজ্ঞানের আলোকে রোজার উপকারিতা
- আপডেট সময় : ০৫:১৮:২০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬
- / ৫০০ বার পড়া হয়েছে
রমজান পবিত্রতম মাস, কোরআন নাজিলের মাস। আর রোজা সেই সময়ের ফরজ ইবাদত। কুরআন, হাদিস ও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুসারে এই মাস ও ইবাদতে মানবজীবনে, স্বাস্থ্য ও সমাজে যে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে, তা আমাদের জন্য অনুধাবনের বিষয়।
রমজান কেবল একটি ধর্মীয় মাস নয়; এটি মানবজীবনের সার্বিক কল্যাণের এক পরিপূর্ণ প্রশিক্ষণকাল। আত্মসংযম, ত্যাগ, সহমর্মিতা, নৈতিক শুদ্ধতা ও শারীরিক সুস্থতার এক অনবদ্য সমন্বয় এই মাহে রমজান। ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ রোজা মানুষকে আল্লাহভীতির পথে পরিচালিত করার পাশাপাশি সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনধারা গড়ে তোলে।
রোজা’ শব্দটি ফারসি, আর এর আরবি পরিভাষা ‘সওম’। শরিয়তের পরিভাষায় এটি সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়তসহ পানাহার, কামাচার ও সব ধরনের অসংযম থেকে বিরত থাকার নাম। অন্যদিকে, রমজান হলো হিজরি বর্ষের নবম মাস, যা মানুষের জন্য বিশেষ বরকতময় সময় হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। রোজা এই মাসের মূল ইবাদত।
কুরআনের আলোকে রোজার ফরজিয়ত ও উদ্দেশ্য-
পবিত্র কুরআন মানবজীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সংবিধান। আল্লাহ তা‘আলা বলেন হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।(সূরা আল-বাকারা : ১৮৩)
রোজার মূল লক্ষ্য হলো তাকওয়া অর্জনÑআত্মসংযম, আল্লাহভীতি ও নৈতিক পরিশুদ্ধি। এটি মানুষের চরিত্র ও সমাজকে অন্যায় ও অবিচার থেকে রক্ষা করে।
রমজান মাসের মর্যাদা এবং রোগী ও সফরকারী বান্দাদের জন্য ছাড়ের বিধানও কুরআনে এসেছেÑরমজান মাসÑএ মাসেই নাজিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হিদায়াত ও হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী। অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস পাবে, সে যেন রোজা রাখে। আর যদি কেউ অসুস্থ বা সফরকারী হয়, সে অন্য সময় পূরণ করবে। আল্লাহ চান তোমাদের জন্য যা সহজ।(সূরা আল-বাকারা : ১৮৫) এ আয়াত প্রমাণ করে, রোজা কেবল ইবাদত নয়; এটি শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনধারার শিক্ষা।
হাদিসে রমজানের ফজিলত-
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেনÑযখন রমজান আসে, জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করা হয় এবং শয়তান শৃঙ্খলিত করা হয়।” (সহিহ বুখারি : ১৮৯৯; সহিহ মুসলিম : ১০৭৯) যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ছাওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (সহিহ বুখারি : ৩৮; সহিহ মুসলিম : ৭৬০) কুদসি হাদিসে আল্লাহ বলেনÑরোজা একান্তই আমার জন্য, আর আমিই এর প্রতিদান দেব। (সহিহ বুখারি : ১৯০৪; সহিহ মুসলিম : ১১৫১) আরেক হাদিসে বলা হয়েছেÑরোজা ও কুরআন (কিয়ামতের দিন) বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, ‘হে পরওয়ারদিগার! আমি তাকে খাদ্য ও কাম প্রবৃত্তি থেকে দিনের বেলা বাধা প্রদান করেছি।-(বায়হাকী ও শুআবুল ঈমান) এটি প্রমাণ করে, রোজা এমন একটি ইবাদত যার অতুলনীয় মর্যাদা ও সওয়াব আল্লাহ নিজেই দান করেন। আত্মশুদ্ধি ও সামাজিক ভারসাম্য-
রমজান মানুষের নফসে আম্মারাকে নিয়ন্ত্রণ করে, এবং ধীরে ধীরে মানুষকে নফসে লাওয়্যামা ও নফসে মুতমাইন্নার পথে নিয়ে যায়। সংযম ও ত্যাগের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন সম্ভব। রোজার মাধ্যমে সমাজেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। যাকাত, ফিতরা ও দানের মাধ্যমে ধনী-গরিবের ব্যবধান কমে আসে। সামাজিক সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেনÑযে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও অসৎ কাজ পরিত্যাগ করে না, তার শুধু পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। (সহিহ বুখারি : ৬০৫৭) অর্থাৎ, রোজা শুধু ক্ষুধা-তৃষ্ণার নাম নয়; এটি নৈতিক ও আত্মিক শুদ্ধতার বাস্তব অনুশীলন।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে রোজার উপকারিতা-
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান স্বীকার করেÑনিয়ন্ত্রিত উপবাস দেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী। অতিভোজন ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস শরীরে বিষাক্ত উপাদান ও চর্বি জমা করে, যা জটিল রোগ পারকিনসনস্, আলজহেইমার, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, গ্যাস্ট্রিক ও লিভারজনিত রোগের কারণ হয়।
* জাপানী বিজ্ঞানী ইউশোনরি ওশুমি ২০১৬ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার জয় করেছিলেন ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং তথা এই রোজা কিভাবে শরীরের কোষে জমে থাকা ধ্বংশ হয়ে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সরিয়ে শরীরকে আবার পুনর্গঠন করে তা প্রমান করতে পেরে।
* রোজা পাকস্থলীকে বিশ্রাম দেয় এবং বিপাকক্রিয়াকে পুনর্গঠন করে।
* ঢাকা মেডিকেল কলেজের ডা. গোলাম মোয়াজ্জেম গবেষণায় উল্লেখ করেছেনÑরোজার ফলে শরীরের ওজন সামান্য কমলেও তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং অতিরিক্ত মেদ কমাতে কার্যকর।
* পাকিস্তানের প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ হোসেন বলেন নিয়মিত রোজাদারদের মধ্যে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হজমজনিত রোগ তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়।
* জার্মান চিকিৎসক ড. ফ্রেডরিক হানেমান রোজাকে গ্যাস্ট্রিক আলসারের চিকিৎসায় কার্যকর বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
* অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুসারে, রোজা দেহের প্রাকৃতিক ডিটক্স প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করে।
* মনস্তত্ত্ববিদ সিগমন্ড ফ্রয়েড উপবাসকে মানসিক রোগ নিরাময়ে সহায়ক হিসেবে দেখেছেন।
* মহাত্মা গান্ধী উপবাসকে আত্মশুদ্ধি ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির অন্যতম উপায় হিসেবে বিবেচনা করতেন।
আন্তর্জাতিক গবেষণা ও পরিসংখ্যান-
* পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞরা দেখেছেন, নাক, কান ও গলার সংক্রমণ রমজান মাসে কম দেখা যায়।
* খাদ্য কম খাওয়ার ফলে লিভার ও পাকস্থলীর রোগ কম হয়।
* নিয়মিত নামাজ ও অজুর কারণে মস্তিষ্ক ও হৃদরোগের ঝুঁকিও হ্রাস পায়।
রোজা শুধু আত্মিক ও সামাজিক দিক থেকে নয়, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার জন্যও বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর।
পরিশেষে বলতে চাই, রমজান মানবজীবনের জন্য এক অতুলনীয় নিয়ামত। কুরআন, হাদিস ও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুসারে, রোজা আত্মশুদ্ধি, সামাজিক ভারসাম্য ও শারীরিক সুস্থতার এক অনন্য মাধ্যম। যদি ব্যক্তি ও সমাজ রমজানের শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে ধারণ করতে পারে, তবে আমরা গড়ে তুলতে পারি একটি সুস্থ, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে মাহে রমজানের প্রকৃত শিক্ষা অনুধাবন করে আমল করার তাওফিক দান করুন।
মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
চিকিৎসক, কলাম লেখক ও গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
ইমেইল: drmazed96@gmail.com
































