ঢাকা ০৭:৩০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo সেনাপ্রধানের সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ Logo সেনাপ্রধানের সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ Logo স্কুল থেকেই কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে: প্রধানমন্ত্রী Logo এবার ঈদুল আজহায় ট্রেনের টিকিট মিলবে শুধু অনলাইনে Logo ঢাকা বারে সব পদ বিএনপির, একটিও পায়নি জামায়াত Logo গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বিভাগীয় সমাবেশ করবে ১১ দলীয় জোট Logo বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাস সহায়তা দেবে সরকার: প্রধানমন্ত্রী Logo দেশে জঙ্গি তৎপরতা নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থার মহাপরিচালকের সাক্ষাৎ Logo এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা বাতিল; সংসদে বিল পাস

স্বাতন্ত্র্যই কবি ওমর আলীকে বাঁচিয়ে রাখবে

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৪১:৩৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 242
দেশবর্ণ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

কবি ওমর আলী সেই বিরল সৌভাগ্যবানদের অন্যতম, যাদের প্রথম কাব্যগ্রন্থই এনে দেয় বিপুল খ্যাতি এবং সেই সাথে কবি হিসেবেও নিশ্চিত করে দেয় একটা শক্ত অবস্থান। বাংলা সাহিত্যে এরকম দৃষ্টান্ত আমরা কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে দেখি। ফররুখ আহমদ, হেলাল হাফিজ প্রমুখ কবিদের ক্ষেত্রেও কমবেশি এই দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করি। কবি হিসেবে ওমর আলীর যাত্রা শুরু হয় পঞ্চাশের দশকে। তার কবিতার মূল প্রবণতা নারী, প্রেম ও প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। আবহমান বাংলার রূপবৈচিত্র্য, লোকাচার এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনপ্রবাহের অনুপুঙ্খ চিত্র তাঁর কবিতায় নানাভাবে ধরা দিয়েছে। জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলার নিসর্গ প্রকৃতি এবং জসীমউদ্দীনের গ্রাম বাংলার সহজ সরল জীবনালেখ্যের প্রতিচ্ছবি আমরা ওমর আলীর কবিতার মধ্যে খুঁজে পাই। কিন্তু ওমর আলীর কবিতার স্বর এবং শৈলী তাদের থেকে স্বতন্ত্র। আল মাহমুদের কবিতায় বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের যে চিত্র ফুটে ওঠে অথবা কবি বন্দে আলী মিয়ার কবিতায় গ্রামীণ জনপদের যে বয়ান উঠে আসে, কবি ওমর আলীর কবিতায় তা পরিস্ফুটিত হয় তাঁর নিজস্ব ঢং এবং প্রকরণে। কবি ওমর আলী তাঁর নিজস্ব কাব্যভাষা এবং মনন দিয়ে বাংলার লোকজ জীবনকে তাঁর কবিতায় তুলে এনেছেন। পাড়াগাঁয়ের মালেকা, সকিনা, বিমলা, হাসিনা, ফরিদা, রমজান, গণেশ, সালাম—এদের জীবনের তুচ্ছ গল্প, ঘটনা পরম মমতায় কবি তাঁর কবিতায় তুলে এনেছেন। এছাড়া যেসব অঞ্চলে তিনি বিচরণ করেছেন, যেমন—কোশাখালি, কোমরপুর, ঘোষপুর, রাঘবপুর, শিলাইদহ, মহেন্দ্রপুর, পোড়াদহ, আতাইকুলা, ভেড়ামারা—এসব স্থান তাঁর কবিতায় অকুণ্ঠভাবে ঠাঁই পেয়েছে। ওমর আলীর কবিতার যে স্বাতন্ত্র্য, তা সহজেই চোখে পড়ে, যার দ্বারা অন্যদের কবিতা থেকে পৃথক করা যায়।

কবি ওমর আলীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম আছে শুনেছি” প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে, যখন তার বয়স মাত্র একুশ বছর। প্রথম গ্রন্থেই তিনি প্রবল খ্যাতি পেয়ে যান এবং আজও তার নাম উচ্চারিত হলেই চলে আসে এই কাব্যগ্রন্থের কথা। প্রথম বইয়ের তুমুল জনপ্রিয়তা ওমর আলীকে প্রবলভাবে উৎসাহিত করে। তবে একথা অনস্বীকার্য, তাঁর পরবর্তী জীবনের আর কোনো কাব্যগ্রন্থই “এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম আছে শুনেছি”-কে অতিক্রম করতে পারেনি।

এই গ্রন্থে মোট পঞ্চাশটি কবিতা রয়েছে। অধিকাংশ কবিতার বিষয়বস্তু প্রেম, প্রকৃতি ও নারী। এরমধ্যে বেশ কয়েকটি কবিতা কবির মৃত্যুভাবনাকে কেন্দ্র করে রচিত।

পঞ্চাশটি কবিতার মধ্যে একুশটি লেখা হয়েছে সনেট ফরমেটে। এবং দেখা যায়, সনেট ফরমেটের কবিতাগুলো ভাষাশৈলী এবং শিল্পসুষমায় বিপুল ঐশ্বর্যমণ্ডিত। তবে এই গ্রন্থের কিছু কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যেমন—

পথের দুপাশে আম-কাঁঠাল গাছের নিচে ঘাসে

উজ্জ্বল রৌদ্রের দিনে এমন সুন্দর দুপুরের

ছায়া যদি চিরকাল দেখতাম! দূরের আকাশে

কয়েকটি কালো রেখার মতো চিল ওড়ে।

(চলার পথে, প্রাগুক্ত)

অথবা—

বলেছিল, এই সব রাঙা দিন, সুনীল রাত্রির

নক্ষত্রেরা নিভে যাবে, ঝরে যাবে বসন্তের ফুল,

এবং আমরা মুছে যাব যেন ভোরের শিশির;

ঝরে যাব, যে রকম ঝরে যায় পলাশ-বকুল।

(সেই নারী তুমি, প্রাগুক্ত)

তবে জীবনানন্দ দাশের এই প্রভাব তার পরবর্তী কাব্যগ্রন্থগুলোতে কাটিয়ে ওঠেন।

এই গ্রন্থের প্রথম কবিতা “এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম আছে শুনেছি”। মাত্র ষোলো লাইনের একটি কবিতায় বাংলার চিরকালীন নারীর স্বভাব, চাওয়া-পাওয়া, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা অসম্ভব শিল্পকুশলতায় চিত্রিত হয়েছে। শিল্পীর মায়াভরা আঁচড় আর দরদে উঠে এসেছে নারীর সংসার আর সন্তানের প্রতি প্রবল ভালোবাসার পেলব স্বপ্নগাথা। তার নিষ্পাপ, সরল হাসিমাখা মুখের লাবণ্য আর স্বামীর কল্যাণ কামনায় ঘিরে থাকা মায়াবী চাহনি শৈল্পিক ব্যঞ্জনায় ভাস্বর হয়ে উঠেছে। গ্রামীণ শ্যামলবরণ রমণীর শরীর ও রূপের বর্ণনায় কবির নিপুণতা প্রশ্নাতীত।

সে শুধু অবাক হয়ে চেয়ে থাকে হরিণীর মতো

মায়াবী উচ্ছল দুটি চোখে, তার সমস্ত শরীরে

এ দেশেরই কোনো এক নদীর জোয়ার বাঁধভাঙা;

হালকা লতার মতো শাড়ি তার দেহ থাকে ঘিরে।

(এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি)

“ঝড়ের রাত্রিতে নৌকায়” কবিতায় আমরা এক দুরন্ত প্রেমিকের দেখা পাই, যিনি পদ্মার উপরে উত্তাল ঝড়ের কবলে পতিত নৌকার সহযাত্রী প্রেয়সীকে অভয় দিচ্ছেন এভাবে—

তবু তুমি পেয়ো নাকো ভয়, যদি দেখো আমাদের

খুব ছোট নাওখানা মোচার খোলার মতো শত

হাজার ঢেউয়ের পরে যত ডোবে আর ভাসে, তত

মেঘের গর্জন, বৃষ্টি, ভেবো, বুঝি ইতি জীবনের;

তখনও পেয়ো না ভয়, ধরে থেকো আমাকে দুহাতে,

আমি নিরাপদে নৌকা নিয়ে যাব সেই ঝড়ো রাতে।

(ঝড়ের রাত্রিতে নৌকায়, এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম আছে শুনেছি)

কবি গ্রামের ছেলে। গ্রামীণ আবহে তিনি বেড়ে উঠেছেন। বহু দূরের দিগন্তরেখা বরাবর যে নীল গ্রাম দেখা যায়, সেই গ্রামে ঘরবাড়ি, বাতাস, রোদ, বৃষ্টি সবই আছে। নানা জাতের পাখি, ফুল, পশু এমনকি বহমান নদীও দেখা যায় সেখানে। কিন্তু কবির দৃষ্টি অন্যত্র। কবি কল্পনায় দেখতে পান—

নীল গ্রামে নীল-চোখ মেয়ে আছে। কথা নেই মুখে।

আয়ত কাজল চোখে কত কথা জড়াজড়ি করে।

অবাধ্য সৌন্দর্য ভরা দেহে সে রঙিন শাড়ি পরে।

বাতাস, নদীর ভাষা শিহরণ আনে তার বুকে।

(নীল গ্রাম, এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম আছে শুনেছি)

“এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম আছে শুনেছি” কাব্যগ্রন্থে কবি যে প্রেমের বন্দনা করেছেন তা কোনো নিষ্কাম প্লেটোনিক প্রেম নয়। একান্তই রক্ত-মাংসের নরনারীর দেহজ প্রেম।

রক্ত-মাংস-শরীরের তপ্ত প্রেম তুমিই শেখালে,

মত্ত, আচ্ছন্ন আমি, সুন্দরী, তোমার মায়াজালে।

(একদিন তুমি, প্রাগুক্ত)

কবি ওমর আলীর প্রেমের কবিতার অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে আমরা প্রকৃতির উপস্থিতি লক্ষ্য করি। প্রকৃতির ফুল, নদী, পাখির উপমায় কবি প্রেমকে মূর্ত করেন। প্রকৃতির এসব উপাদান যেন তার প্রেমের ছায়াসঙ্গী। প্রকৃতি যেমন জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে, কবির প্রেমও প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে যেন বাঁচতে পারে না। প্রেম, নারী ও প্রকৃতি কবি ওমর আলীর কবিতায় একাকার হয়ে মিশে আছে।

ওইখানে চলো শুয়ে থাকি সারাদিন, সারারাত।

যেখানে সুন্দর নদী, শিয়ালকাঁটার ঘনবন।

বকুলের ঝরাপাতা মাঠ। কিংবা হাওয়ার আঘাত

তৃণশীর্ষে ঝুমকোলতার বুকে আনে শিহরণ।

(গ্রামে, এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম আছে শুনেছি)

অথবা—

নিঃসঙ্গ পাখির কণ্ঠ শুনে আমি উদাস, ব্যাকুল।

বিকেলের শান্তছায়া, আকাশের চুপি চুপি স্বর

আমাকে যন্ত্রণা দেয়, সব কাজে হয়ে যায় ভুল।

বারবার মনে আসে, তোমার মধুর ওষ্ঠাধর।

(ফরহাদের প্রতি শিরিণ, প্রাগুক্ত)

কবি ওমর আলী মূলত গ্রামীণ অনুষঙ্গকে উপজীব্য করে কাব্যসাধনা করে গেছেন। তবে তার প্রথম গ্রন্থে এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। আঞ্চলিক শব্দের ব্যঞ্জনাসমৃদ্ধ একটি কবিতা আছে এই বইয়ে; খুবই সফল একটি কবিতা। তার কিছু অংশ এরকম:

আমি কিন্তু যামুগা। আমারে যদি বেশি ঠাট্টা করো।

হুঁ, আমারে চেতাইলে তোমার লগে আমি থাকুম না।

আমারে যতই কও, তোতা পাখি, চান, মণি, সোনা।

আমারে খারাপ কথা কও ক্যান, চুল টেনে ধরো।

(আমি কিন্তু যামুগা, এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম আছে শুনেছি)

প্রেম ও প্রকৃতির সঙ্গে কবির নিবিড় বন্ধনের মাঝেও মৃত্যুভাবনা কবিকে আচ্ছন্ন করে। কবি মনে করেন প্রকৃতির সকল কিছুই থেকে যাবে, কারও কোনো পরিবর্তন হবে না। শুধু একদিন তিনি এই পৃথিবীতে থাকবেন না।

তারপর আর এক রাত্রিতে ওই নীল আকাশের

পরিষ্কার বাগানে তারার ফুল প্রস্ফুটিত হবে

আমার প্রদীপ শুধু নিভে যাবে অনন্ত নীরবে।

(আর এক রাত্রিতে, প্রাগুক্ত)

অথবা—

আমারও প্রাণের আয়ু শেষ হয়ে যেতেছে তাহলে,

একটি নিঃশ্বাস থেকে মনে হয় আরেক নিঃশ্বাসে

আমিও যেতেছি কমে; যেরকম ধীরে ধীরে গলে

মোমের প্রদীপ জ্বলে আগুনের উত্তাপে, বাতাসে।

(সময়, প্রাগুক্ত)

পঞ্চাশের দশকে কবি ওমর আলীর প্রথম কবিতা ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়। কবিজীবনের শুরুতে সমসাময়িক সকল গুরুত্বপূর্ণ কবির সাথে তার সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে জীবন ও জীবিকার তাগিদে তার রাজধানী জীবনের ইতি ঘটে। তিনি পাবনায় কোমরপুরের নিভৃত পল্লিতে থিতু হন। চাকরিজীবন অতিবাহিত হয়েছে সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজে ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনা করে।

কবি ওমর আলী যে অসীম সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন, নানা কারণে সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি। হয়তো কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্নতা তার একটা কারণ। তবে আধুনিক বাংলা কবিতায় ওমর আলী স্বতন্ত্র একটি স্বর তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কাব্যস্বরের এই স্বাতন্ত্র্যই কবি ওমর আলীকে বাঁচিয়ে রাখবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

সীমান্তের কৃষকদের পাশে কৃষি বিভাগ, রাণীশংকৈলে বিনামূল্যে বীজ-সার বিতরণ রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি: হাসিনুজ্জামান মিন্টু ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার কৃষকদের কৃষি উৎপাদনে আরও উৎসাহিত করতে বিশেষ কৃষি সহায়তা কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিবি) এর আওতায় পরিচালিত এ কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে ধানের বীজ ও সার বিতরণ করা হয়। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) দুপুরে উপজেলা কৃষি অফিস চত্বরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ খাদিজা বেগম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম। এসময় উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রুপম চন্দ্র মহন্ত, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আব্দুস সামাদ প্রধান, এলজিইডির প্রতিনিধি মোহাম্মদ আলীসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। উপজেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত এ কর্মসূচির আওতায় সীমান্ত এলাকার ৮০ জন কৃষকের মাঝে কৃষি উপকরণ বিতরণ করা হয়। প্রত্যেক কৃষককে ১০ কেজি ব্রি জাতের রোপা আমন ধানের বীজ এবং ২৬ কেজি বিভিন্ন ধরনের সার প্রদান করা হয়েছে। কৃষি বিভাগ জানায়, সীমান্ত এলাকায় পাট, আখ ও ভুট্টার মতো অধিক উচ্চতার ফসলের পরিবর্তে ধানসহ অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতার ফসল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর হবে। উপস্থিত কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের সহায়তা কর্মসূচি কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে কৃষিকাজে আগ্রহ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

স্বাতন্ত্র্যই কবি ওমর আলীকে বাঁচিয়ে রাখবে

আপডেট সময় : ১০:৪১:৩৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

কবি ওমর আলী সেই বিরল সৌভাগ্যবানদের অন্যতম, যাদের প্রথম কাব্যগ্রন্থই এনে দেয় বিপুল খ্যাতি এবং সেই সাথে কবি হিসেবেও নিশ্চিত করে দেয় একটা শক্ত অবস্থান। বাংলা সাহিত্যে এরকম দৃষ্টান্ত আমরা কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে দেখি। ফররুখ আহমদ, হেলাল হাফিজ প্রমুখ কবিদের ক্ষেত্রেও কমবেশি এই দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করি। কবি হিসেবে ওমর আলীর যাত্রা শুরু হয় পঞ্চাশের দশকে। তার কবিতার মূল প্রবণতা নারী, প্রেম ও প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। আবহমান বাংলার রূপবৈচিত্র্য, লোকাচার এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনপ্রবাহের অনুপুঙ্খ চিত্র তাঁর কবিতায় নানাভাবে ধরা দিয়েছে। জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলার নিসর্গ প্রকৃতি এবং জসীমউদ্দীনের গ্রাম বাংলার সহজ সরল জীবনালেখ্যের প্রতিচ্ছবি আমরা ওমর আলীর কবিতার মধ্যে খুঁজে পাই। কিন্তু ওমর আলীর কবিতার স্বর এবং শৈলী তাদের থেকে স্বতন্ত্র। আল মাহমুদের কবিতায় বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের যে চিত্র ফুটে ওঠে অথবা কবি বন্দে আলী মিয়ার কবিতায় গ্রামীণ জনপদের যে বয়ান উঠে আসে, কবি ওমর আলীর কবিতায় তা পরিস্ফুটিত হয় তাঁর নিজস্ব ঢং এবং প্রকরণে। কবি ওমর আলী তাঁর নিজস্ব কাব্যভাষা এবং মনন দিয়ে বাংলার লোকজ জীবনকে তাঁর কবিতায় তুলে এনেছেন। পাড়াগাঁয়ের মালেকা, সকিনা, বিমলা, হাসিনা, ফরিদা, রমজান, গণেশ, সালাম—এদের জীবনের তুচ্ছ গল্প, ঘটনা পরম মমতায় কবি তাঁর কবিতায় তুলে এনেছেন। এছাড়া যেসব অঞ্চলে তিনি বিচরণ করেছেন, যেমন—কোশাখালি, কোমরপুর, ঘোষপুর, রাঘবপুর, শিলাইদহ, মহেন্দ্রপুর, পোড়াদহ, আতাইকুলা, ভেড়ামারা—এসব স্থান তাঁর কবিতায় অকুণ্ঠভাবে ঠাঁই পেয়েছে। ওমর আলীর কবিতার যে স্বাতন্ত্র্য, তা সহজেই চোখে পড়ে, যার দ্বারা অন্যদের কবিতা থেকে পৃথক করা যায়।

কবি ওমর আলীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম আছে শুনেছি” প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে, যখন তার বয়স মাত্র একুশ বছর। প্রথম গ্রন্থেই তিনি প্রবল খ্যাতি পেয়ে যান এবং আজও তার নাম উচ্চারিত হলেই চলে আসে এই কাব্যগ্রন্থের কথা। প্রথম বইয়ের তুমুল জনপ্রিয়তা ওমর আলীকে প্রবলভাবে উৎসাহিত করে। তবে একথা অনস্বীকার্য, তাঁর পরবর্তী জীবনের আর কোনো কাব্যগ্রন্থই “এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম আছে শুনেছি”-কে অতিক্রম করতে পারেনি।

এই গ্রন্থে মোট পঞ্চাশটি কবিতা রয়েছে। অধিকাংশ কবিতার বিষয়বস্তু প্রেম, প্রকৃতি ও নারী। এরমধ্যে বেশ কয়েকটি কবিতা কবির মৃত্যুভাবনাকে কেন্দ্র করে রচিত।

পঞ্চাশটি কবিতার মধ্যে একুশটি লেখা হয়েছে সনেট ফরমেটে। এবং দেখা যায়, সনেট ফরমেটের কবিতাগুলো ভাষাশৈলী এবং শিল্পসুষমায় বিপুল ঐশ্বর্যমণ্ডিত। তবে এই গ্রন্থের কিছু কবিতায় কবি জীবনানন্দ দাশের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যেমন—

পথের দুপাশে আম-কাঁঠাল গাছের নিচে ঘাসে

উজ্জ্বল রৌদ্রের দিনে এমন সুন্দর দুপুরের

ছায়া যদি চিরকাল দেখতাম! দূরের আকাশে

কয়েকটি কালো রেখার মতো চিল ওড়ে।

(চলার পথে, প্রাগুক্ত)

অথবা—

বলেছিল, এই সব রাঙা দিন, সুনীল রাত্রির

নক্ষত্রেরা নিভে যাবে, ঝরে যাবে বসন্তের ফুল,

এবং আমরা মুছে যাব যেন ভোরের শিশির;

ঝরে যাব, যে রকম ঝরে যায় পলাশ-বকুল।

(সেই নারী তুমি, প্রাগুক্ত)

তবে জীবনানন্দ দাশের এই প্রভাব তার পরবর্তী কাব্যগ্রন্থগুলোতে কাটিয়ে ওঠেন।

এই গ্রন্থের প্রথম কবিতা “এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম আছে শুনেছি”। মাত্র ষোলো লাইনের একটি কবিতায় বাংলার চিরকালীন নারীর স্বভাব, চাওয়া-পাওয়া, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা অসম্ভব শিল্পকুশলতায় চিত্রিত হয়েছে। শিল্পীর মায়াভরা আঁচড় আর দরদে উঠে এসেছে নারীর সংসার আর সন্তানের প্রতি প্রবল ভালোবাসার পেলব স্বপ্নগাথা। তার নিষ্পাপ, সরল হাসিমাখা মুখের লাবণ্য আর স্বামীর কল্যাণ কামনায় ঘিরে থাকা মায়াবী চাহনি শৈল্পিক ব্যঞ্জনায় ভাস্বর হয়ে উঠেছে। গ্রামীণ শ্যামলবরণ রমণীর শরীর ও রূপের বর্ণনায় কবির নিপুণতা প্রশ্নাতীত।

সে শুধু অবাক হয়ে চেয়ে থাকে হরিণীর মতো

মায়াবী উচ্ছল দুটি চোখে, তার সমস্ত শরীরে

এ দেশেরই কোনো এক নদীর জোয়ার বাঁধভাঙা;

হালকা লতার মতো শাড়ি তার দেহ থাকে ঘিরে।

(এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি)

“ঝড়ের রাত্রিতে নৌকায়” কবিতায় আমরা এক দুরন্ত প্রেমিকের দেখা পাই, যিনি পদ্মার উপরে উত্তাল ঝড়ের কবলে পতিত নৌকার সহযাত্রী প্রেয়সীকে অভয় দিচ্ছেন এভাবে—

তবু তুমি পেয়ো নাকো ভয়, যদি দেখো আমাদের

খুব ছোট নাওখানা মোচার খোলার মতো শত

হাজার ঢেউয়ের পরে যত ডোবে আর ভাসে, তত

মেঘের গর্জন, বৃষ্টি, ভেবো, বুঝি ইতি জীবনের;

তখনও পেয়ো না ভয়, ধরে থেকো আমাকে দুহাতে,

আমি নিরাপদে নৌকা নিয়ে যাব সেই ঝড়ো রাতে।

(ঝড়ের রাত্রিতে নৌকায়, এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম আছে শুনেছি)

কবি গ্রামের ছেলে। গ্রামীণ আবহে তিনি বেড়ে উঠেছেন। বহু দূরের দিগন্তরেখা বরাবর যে নীল গ্রাম দেখা যায়, সেই গ্রামে ঘরবাড়ি, বাতাস, রোদ, বৃষ্টি সবই আছে। নানা জাতের পাখি, ফুল, পশু এমনকি বহমান নদীও দেখা যায় সেখানে। কিন্তু কবির দৃষ্টি অন্যত্র। কবি কল্পনায় দেখতে পান—

নীল গ্রামে নীল-চোখ মেয়ে আছে। কথা নেই মুখে।

আয়ত কাজল চোখে কত কথা জড়াজড়ি করে।

অবাধ্য সৌন্দর্য ভরা দেহে সে রঙিন শাড়ি পরে।

বাতাস, নদীর ভাষা শিহরণ আনে তার বুকে।

(নীল গ্রাম, এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম আছে শুনেছি)

“এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম আছে শুনেছি” কাব্যগ্রন্থে কবি যে প্রেমের বন্দনা করেছেন তা কোনো নিষ্কাম প্লেটোনিক প্রেম নয়। একান্তই রক্ত-মাংসের নরনারীর দেহজ প্রেম।

রক্ত-মাংস-শরীরের তপ্ত প্রেম তুমিই শেখালে,

মত্ত, আচ্ছন্ন আমি, সুন্দরী, তোমার মায়াজালে।

(একদিন তুমি, প্রাগুক্ত)

কবি ওমর আলীর প্রেমের কবিতার অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে আমরা প্রকৃতির উপস্থিতি লক্ষ্য করি। প্রকৃতির ফুল, নদী, পাখির উপমায় কবি প্রেমকে মূর্ত করেন। প্রকৃতির এসব উপাদান যেন তার প্রেমের ছায়াসঙ্গী। প্রকৃতি যেমন জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে, কবির প্রেমও প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে যেন বাঁচতে পারে না। প্রেম, নারী ও প্রকৃতি কবি ওমর আলীর কবিতায় একাকার হয়ে মিশে আছে।

ওইখানে চলো শুয়ে থাকি সারাদিন, সারারাত।

যেখানে সুন্দর নদী, শিয়ালকাঁটার ঘনবন।

বকুলের ঝরাপাতা মাঠ। কিংবা হাওয়ার আঘাত

তৃণশীর্ষে ঝুমকোলতার বুকে আনে শিহরণ।

(গ্রামে, এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম আছে শুনেছি)

অথবা—

নিঃসঙ্গ পাখির কণ্ঠ শুনে আমি উদাস, ব্যাকুল।

বিকেলের শান্তছায়া, আকাশের চুপি চুপি স্বর

আমাকে যন্ত্রণা দেয়, সব কাজে হয়ে যায় ভুল।

বারবার মনে আসে, তোমার মধুর ওষ্ঠাধর।

(ফরহাদের প্রতি শিরিণ, প্রাগুক্ত)

কবি ওমর আলী মূলত গ্রামীণ অনুষঙ্গকে উপজীব্য করে কাব্যসাধনা করে গেছেন। তবে তার প্রথম গ্রন্থে এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। আঞ্চলিক শব্দের ব্যঞ্জনাসমৃদ্ধ একটি কবিতা আছে এই বইয়ে; খুবই সফল একটি কবিতা। তার কিছু অংশ এরকম:

আমি কিন্তু যামুগা। আমারে যদি বেশি ঠাট্টা করো।

হুঁ, আমারে চেতাইলে তোমার লগে আমি থাকুম না।

আমারে যতই কও, তোতা পাখি, চান, মণি, সোনা।

আমারে খারাপ কথা কও ক্যান, চুল টেনে ধরো।

(আমি কিন্তু যামুগা, এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম আছে শুনেছি)

প্রেম ও প্রকৃতির সঙ্গে কবির নিবিড় বন্ধনের মাঝেও মৃত্যুভাবনা কবিকে আচ্ছন্ন করে। কবি মনে করেন প্রকৃতির সকল কিছুই থেকে যাবে, কারও কোনো পরিবর্তন হবে না। শুধু একদিন তিনি এই পৃথিবীতে থাকবেন না।

তারপর আর এক রাত্রিতে ওই নীল আকাশের

পরিষ্কার বাগানে তারার ফুল প্রস্ফুটিত হবে

আমার প্রদীপ শুধু নিভে যাবে অনন্ত নীরবে।

(আর এক রাত্রিতে, প্রাগুক্ত)

অথবা—

আমারও প্রাণের আয়ু শেষ হয়ে যেতেছে তাহলে,

একটি নিঃশ্বাস থেকে মনে হয় আরেক নিঃশ্বাসে

আমিও যেতেছি কমে; যেরকম ধীরে ধীরে গলে

মোমের প্রদীপ জ্বলে আগুনের উত্তাপে, বাতাসে।

(সময়, প্রাগুক্ত)

পঞ্চাশের দশকে কবি ওমর আলীর প্রথম কবিতা ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়। কবিজীবনের শুরুতে সমসাময়িক সকল গুরুত্বপূর্ণ কবির সাথে তার সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে জীবন ও জীবিকার তাগিদে তার রাজধানী জীবনের ইতি ঘটে। তিনি পাবনায় কোমরপুরের নিভৃত পল্লিতে থিতু হন। চাকরিজীবন অতিবাহিত হয়েছে সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজে ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনা করে।

কবি ওমর আলী যে অসীম সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন, নানা কারণে সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি। হয়তো কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্নতা তার একটা কারণ। তবে আধুনিক বাংলা কবিতায় ওমর আলী স্বতন্ত্র একটি স্বর তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কাব্যস্বরের এই স্বাতন্ত্র্যই কবি ওমর আলীকে বাঁচিয়ে রাখবে।