উপকূলজুড়ে নদীভাঙনের তাণ্ডব: বামনায় ঝুঁকিতে খাদ্যগুদাম, আবাসন প্রকল্প ও একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
- আপডেট সময় : ১২:৫৪:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬
- / 27
উপকূলজুড়ে নদীভাঙনের তাণ্ডব: বামনায় ঝুঁকিতে খাদ্যগুদাম, আবাসন প্রকল্প ও একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ তানভীর, বামনা (বরগুনা) প্রতিনিধি:
উপকূলজুড়ে আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে নদীভাঙন। বরগুনার বামনা উপজেলায় বিষখালী নদীর তীব্র ভাঙনে হুমকির মুখে পড়েছে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং হাজারো মানুষের বসতভিটা।
উপজেলার একমাত্র সরকারি খাদ্যগুদামটি বিষখালী নদীর তীরে অবস্থিত, যেখানে ১২০০ থেকে ১৫০০ টন খাদ্যশস্য মজুদ থাকে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে গুদামটি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা সরকারের কোটি টাকার ক্ষতির কারণ হতে পারে এবং খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থায় মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।
খাদ্যগুদামের পাশেই সরকারের নির্মিত ভূমিহীনদের আবাসন প্রকল্পে শতাধিক হিন্দু-মুসলিম পরিবার বসবাস করছে। নদীভাঙনের ফলে এসব পরিবারও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
চেঁচান, কলাগাছিয়া সংলগ্ন পূর্ব সফিপুর এলাকায় প্রায় ৭ হাজার ৩৬৫ মানুষের বসবাস। একইসঙ্গে বেগম ফায়জুন্নেসা মহিলা ডিগ্রি কলেজ, সদর আর রশিদ ফাযিল মাদ্রাসা, ১২ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সৈয়দ নাজমুল আহসান মাধ্যমিক ইনস্টিটিউট, উপজেলা পরিষদ, ২ নং সদর ইউনিয়ন পরিষদ, ফেরিঘাট ও লঞ্চঘাটসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ভাঙনের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
অন্যদিকে, ৩ নং রামনা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে শত শত বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বহু পরিবার সহায়-সম্বল হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে এবং মানবেতর জীবনযাপন করছে।
এদিকে বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি শুরু না হলেও বিষখালী নদীর ভাঙন পরিস্থিতি ইতোমধ্যে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিনই বসতঘর, ফসলি জমি, সড়ক ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নদীতে বিলীন হচ্ছে। ফলে হাজারো মানুষ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে।
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে কলাগাছিয়া লঞ্চঘাট থেকে দক্ষিণ রামনা ও চলাভাংঙ্গা এলাকা। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে যেকোনো সময় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো নদীগর্ভে তলিয়ে যেতে পারে।
দক্ষিণ রামনা এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে। অবশিষ্ট অংশও মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। বাঁধটি ধসে পড়লে বিস্তীর্ণ এলাকা জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মানজুরুর রব মুর্তাযা আহসান বলেন, “নদীভাঙন এখন উপকূলবাসীর নিত্যদিনের আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। স্থায়ী সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়।”
সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক স্থানে কাগজে-কলমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ থাকলেও বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই। কোথাও দায়সারাভাবে নির্মিত রিং বাঁধ জোয়ারের তোড়ে টিকতে পারছে না।
কালিকাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা ও বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান হাসিব বলেন, “প্রতিবছর আমাদের জমি ও ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হচ্ছে। দীর্ঘদিনেও কোনো টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি।”
স্থানীয় সাংবাদিক নাসির উদ্দীন জানান, “গত বছর ফেলা জিও ব্যাগ ছয় মাসও টেকেনি। বিষখালীর স্রোতে সব নদীতে ভেসে গেছে।”
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ২২টি পোল্ডারে মোট ৮০৫ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২ কিলোমিটার মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে কিছু এলাকায় টেকসই বাঁধ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবদুল হান্নান প্রধান বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। নতুন প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, অর্থ বরাদ্দ পেলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।”





























