বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে বেশ কিছু গণভোট
- আপডেট সময় : ০২:৫০:৪০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 258
বাংলাদেশে আজ এমনই একটি নির্বাচনের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে। ইতিহাসের মোড় ঘুরানো কিছু গণভোট আজ ফিরে দেখা যাক-
যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট গণভোট (২০১৬)
ব্রেক্সিট গণভোট কেবল একটি ভোট ছিল না, এটি ছিল ব্রিটিশ সমাজের বিভাজনের প্রতিফলন। কনজারভেটিভ পার্টির অভ্যন্তরীণ কোন্দল মেটাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এ গণভোটের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নে যুক্তরাজ্য থাকবে কি না এটি নিয়েই এ ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
এ গণভোটে প্রায় ৫২ শতাংশ মানুষ ব্রেক্সিটের পক্ষে অর্থাৎ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেয়। ফলস্বরূপ ২০২০ সালে ইইউ থেকে বেরিয়ে আসে যুক্তরাজ্য, যা বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও ইউরোপের ভবিষ্যতকে বদলে দিয়েছে।
কানাডার কুইবেক সার্বভৌমত্ব গণভোট (১৯৯৫)
কানাডার অস্তিত্ব সংকটের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত ছিল কুইবেক সার্বভৌমত্ব গণভোট।
এ ভোটের প্রশ্নটি ছিল অত্যন্ত জটিল। ফলে সরাসরি ‘স্বাধীনতা‘ না বলে ‘সার্বভৌমত্ব ও নতুন অংশীদারিত্ব’ শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল।
তবে মাত্র ০.৬ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে কুইবেক কানাডার সঙ্গেই থেকে যায়।
স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা গণভোট (২০২৪)
স্কটল্যান্ড যুক্তরাজ্যের অংশ হিসেবেই থাকবে, নাকি আলাদা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হবে—এই প্রশ্নকে ঘিরেই ২০১৪ সালে আয়োজন করা হয় বহুল আলোচিত স্বাধীনতা গণভোট। দীর্ঘ রাজনৈতিক আলোচনা ও তীব্র প্রচারণার পর ১৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সেই ভোটে দেশজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ ও অংশগ্রহণ দেখা যায়।
গণভোটের ফলাফলে দেখা যায়, ৫৫ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটার যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকার পক্ষে মত দেন। অন্যদিকে ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ ভোটার স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেন। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে স্কটল্যান্ড যুক্তরাজ্যের অংশ হিসেবেই থেকে যায়।
এই ভোটে অংশগ্রহণের হার ছিল প্রায় ৮৫ শতাংশ, যা স্কটল্যান্ডের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। ব্যাপক ভোটার উপস্থিতি এই গণভোটকে দেশের গণতান্ত্রিক চর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
কাতালোনিয়া স্বাধীনতা গণভোট (২০১৭)
কাতালোনিয়া স্পেন থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করবে কি না—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ২০১৭ সালে আয়োজন করা হয় বহুল আলোচিত একটি গণভোট। দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে এই ভোট অনুষ্ঠিত হয়।
গণভোটে অংশ নেওয়া ভোটারদের অধিকাংশই স্বাধীনতার পক্ষে মত দেন। তবে স্পেন সরকার এই গণভোটকে অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করে। কেন্দ্রীয় সরকারের এমন অবস্থানের ফলে কাতালোনিয়া ও মাদ্রিদের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়।
এর ফলশ্রুতিতে স্পেনে সাংবিধানিক সংকট দেখা দেয় এবং পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে, যা দেশটির রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
পূর্ব তিমুর স্বাধীনতা গণভোট (১৯৯৯)
ইন্দোনেশিয়া থেকে আলাদা হওয়ার জন্য এ গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল। ইন্দোনেশিয়া সরকার কেবল ‘স্বায়ত্তশাসন’ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু মানুষ চেয়েছিল পূর্ণ স্বাধীনতা।
ভোটের পর ইন্দোনেশীয়পন্থী মিলিশিয়ারা পূর্ব তিমুরে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং হাজার হাজার মানুষ হত্যা করে। এরপর অস্ট্রেলিয়ার নেতৃত্বে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী এসে দেশটিকে নিয়ন্ত্রণে নেয়।
দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতা (২০১১)
সুদানে দীর্ঘ ২০ বছরের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটাতে এই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পক্ষে গণভোটে সর্বাধিক রায় আসে। ফলে দক্ষিণ সুদান স্বাধীনতা লাভ করে।
আফ্রিকার মানচিত্রে এটিই সর্বশেষ বড় পরিবর্তন। তবে স্বাধীনতার পর তেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশটি আবারও অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়ে।
ক্রিমিয়া গণভোট (২০১৪)
ক্রিমিয়া রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হবে কি না—এই প্রশ্নকে সামনে রেখে ২০১৪ সালের ১৬ মার্চ ইউক্রেনের এই অঞ্চলটিতে আয়োজন করা হয় একটি গণভোট। তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার পালাবদলের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত এই ভোট দ্রুতই আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।
ঘোষিত ফল অনুযায়ী, প্রায় ৯৫ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে মত দেন। তবে ভোট প্রক্রিয়া ঘিরে বিতর্ক ছিল প্রবল। অনেকেই ভোট বর্জন করেন এবং অংশগ্রহণের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
গণভোটের ফলের ভিত্তিতে ক্রিমিয়া রাশিয়ার অংশ হিসেবে যুক্ত হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই ভোট ব্যাপকভাবে বিতর্কিত হিসেবে চিহ্নিত হয়। পশ্চিমা দেশগুলো একে অবৈধ ঘোষণা করে এবং ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। ফলে বিষয়টি কেবল আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়।

































