ঘাগড়ায় পূর্বশত্রুতার জেরে মতি হত্যা, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হল ১৭ জনকে
- আপডেট সময় : ০১:৪৬:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
- / 37
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারী কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলায় ঘাগড়া ইউনিয়নের সিহারা গ্রামে মতি মিয়া (৬২) নামে এক কৃষককে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে আবু সালাম ও হামিদুর রহমান।
এলাকায় আধিপত্য ও পূর্ব শত্রুতা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আয়ুব আলী প্রভাব বিস্তার করার জন্য পরিকল্পিত ভাবে কৃষক মতি মিয়াকে হত্যার পরিকল্পনা করে। আয়ুব আলীর নির্দেশে মতি মিয়াকে হত্যা করে আবু সালাম ও হামিদুর রহমান।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শের জাহান মোমিনি,আয়ুব আলী ও আবু সালাম এলাকায় বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত আছে। শের জাহান মোমিনির নির্দেশে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আয়ুব আলী ও আবু সালাম। তথ্য অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, আয়ুব আলী ও শের জাহান মোমিনি ঘাগড়া বাজারে দীর্ঘদিন ধরে দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। আয়ুব আলীর ডান হাত হিসেবে কাজ করে আবু সালাম।
ঘাগড়া বাজারে মাদক থেকে শুরু করে সকল অপরাধ পরিচালনা করে আবু সালাম ও হামিদুর। জানা যায়, হামিদুর ঘাগড়া ইউনিয়নে মাদক সরবরাহ করে এবং বিভিন্ন জায়গায় সাপ্লাই করে। তার নামে মিঠামইন থানায় মাদক ও হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
ঘাগড়া ইউনিয়নে আয়ুব আলীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও প্রকাশে মানুষ হত্যার অভিযোগও রয়েছে।
মতি মিয়া হত্যার তথ্য অনুসন্ধানে গিয়ে জানা যায়, ২০১৪ সালে জুলাই মাসে আবদুর রশিদ মিয়া (৬৫) কে কুপিয়ে হত্যা করে আয়ুব আলী ও তার ভাতিজা আবু সালাম। এ হত্যার মামলার মূল আসামি আয়ুব আলী ও আবু সালাম। পরে তাদের আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়। এ মামলায় আয়ুব আলী পলাতক থাকে।
পরে কিছু দিন কারাভোগ করে জামিনে বেরিয়ে আসে আবু সালাম। জামিনে বেরিয়ে এসে আয়ুব আলী প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ভাবে পরিকল্পনা করে। তারই ধারাবাহিকতায় আয়ুব আলী র ভাতিজি ফারুকের মেয়ে তানিয়াকে বাবর আলীর ছেলে আবদুল্লার সাথে বিবাহ করায়। পরে আয়ুব আলী বিরোধিতা করলে ২০২২ সালে জুন মাসে তানিয়া ও আবদুল্লার মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাবর আলীকে হত্যা করে আয়ুব আলী। পরে বাবর আলীর ছেলে শাহ আলম (যাকে টাকার লোভ দেখিয়ে মতি মিয়া হত্যা মামলার ৫ নং স্বাক্ষী করেছে আয়ুব আলী) বাদী হয়ে আয়ুব আলীসহ ১০/১২ জনকে আসামী করে মিঠামইন থানায় মামলা দায়ের করে। এ ঘটনায় সাবেক ইউপি সদস্য হেলিম মেম্বার এর প্রতিবাদ করলে
২০২২ সালের ১১ জুলাই ঘাগড়া বাজার থেকে হেলিম মেম্বারকে নৌকাযোগে অপহরণ করে আয়ুব আলী ও তার ছেলে রাকিব (৪ নং ঘাগড়া ইউনিয়নের ছাত্রলীগের কর্মি) সহ ৬/৭ জন মিলে পিটিয়ে হত্যা করে। পরে হেলিম মেম্বার নিজের মুখে আসামীদের নাম উল্লেখ করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে মারা যান। এ ঘটনায় হেলিম মেম্বারের স্ত্রী বাদী হয়ে আয়ুব আলীসহ ৪২ জনকে লআসামী করে মামলা দায়ের করা হয়।
তখন হেলিম মেম্বারকে হত্যা করে তার প্রতিপক্ষ শাহ আলম গং এর ওপর দায় চাপাতে না পেরে আয়ুব আলী আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। এর পরে ঘটনা আরও ভয়াবহ। হাটুরীয়া নদীর জলমহাল ইজারা নিয়ে শের জাহান মোমিনি এবং প্রতিপক্ষ শাহ আলম গং এর সাথে বিরোধের সৃষ্টি হয়। সেই জলমহাল শাহ আলম গং এর পক্ষে রায় দেয় এসিল্যান্ড। তার পরে শের জাহান মোমিনি ও কিলার আয়ুব আলী মিলে শাহ আলম গং কে বিভিন্ন ভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। দীর্ঘ দিন ধরে চলে তাদের এই পরিকল্পনা।
তারই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারী রাতে মতি মিয়াকে কাজে যাওয়ার কথা বলে আবু সালাম। ওই দিন রাতে মতি মিয়া কাজে যেতে না চাইলে আবু সালাম তাকে জোর করে পাঠায়। কাজে যাওয়ার সময় আবু সালাম মতি মিয়াকে একটি দা ও বল্লম নিয়ে যেতে বলে।
তখন মতি মিয়ার স্ত্রী গোলবাহার আবু সালামকে বলেন ইয়াকুব আমার স্বামীকে কাজে যাবার বারন করছে তুই তোর ভাইকে জোর করে পাডাইলি কেন?
তখন আবু সালাম গোলবাহারকে বলে বাড়ি থাইকা করবে কি? কাজে যাউক। কিছু খাবারের টাহা ঘরে আইবো। ওই দিন রাতে মতি মিয়াকে কাজে পাঠায় আবু সালাম। মতি মিয়া পেশা একজন হতদরিদ্র কৃষক।
ঘটনার দিন (৩১ জানুয়ারী) রাত ৮.৩০ ঘটিকা থেকে পরের দিন (১ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮.৪৫ ঘটিকা পর্যন্ত আবু সালাম ও আয়ুব আলীর কথোপকথনের একাধিক কল লিষ্ট অনুসন্ধানী টিমের হাতে আসছে।
যে কল লিষ্টটে দেখা গেছে তারা দুজন তাদের ফোন থেকে পরস্পরের সাথে ১৬ বার কথা বলেছে। এর মধ্যে ৭ বার তাদের কথা হয়েছে মতি মিয়াকে হত্যার বিষয় নিয়ে। যেটা সন্ধেহের মূল কারণ।
মতি মিয়া হত্যাকান্ড একটি পরিকল্পিত ঘটনা। মতি মিয়াকে হত্যা করে প্রতিপক্ষদেরকে ফাঁসানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। মতি মিয়া হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে অনুসন্ধানী টিমকে বিভিন্ন সময় এলাকার বিভিন্ন লোকের সাথে কথা বলেতে হয়েছে। অনুসন্ধানে আবু সালাম, আয়ুব আলী, আয়ুব আলীর ছেলে রাকিব ও পালের গোদা শের জাহান মোমিনির বিরুদ্ধে ভয়ংকর সব তথ্য হাতে এসেছে।
ঘাগড়া ইউনিয়নের প্রতি জায়গায় তারা সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদকের মত সব অপরাধের সাথে যুক্ত।
আয়ুব আলীর বিরুদ্ধে মিঠামইন থানায় ৩ টা হত্যা মামলা ও ১ টি অস্ত্র মামলা রয়েছে। আবু সালামের বিরুদ্ধেও রয়েছে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা।
মতি মিয়াকে হত্যা করে তারা তাদের মিশন সম্পন্ন করেছে। আয়ুব আলীর ছেলে রাকিবের একটি ফেসবুক (মোহাম্মদ রাকিব) আইডি থেকে পোষ্ট করা হয়েছে যে, (Mission success, but next target number one) এই পোস্ট পড়লেই বোঝা যায় যে, তারা মতি মিয়াকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করে তাদের প্রতিপক্ষদের ফাঁসিয়েছে।
এই হত্যা মামলার আসামী করা হয়েছে ১৭ জনকে। যারা এলাকায় কোন হামলা-মামলার সাথে জড়িত না। অন্য দিকে মতি মিয়ার স্ত্রী গোলবাহার তাদের নিজেদের স্বার্থ্য হাসিল করার জন্য এ হত্যার নাটক সাজিয়েছে। মতি মিয়া হত্যার স্বাক্ষী হিসেবে ১৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বাক্ষীদের মধ্যে ১নং স্বাক্ষী মর্তুজ আলী ঘটনার দিন তার কর্মস্থল চট্টগ্রামে ছিলেন সেখান থেকে সে হত্যার ঘটনাটি কি ভাবে দেখলো এবং স্বাক্ষী হলেন?
এ বিষয়ে মর্তুজ আলীর সাথে কথা বললে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
২ নং স্বাক্ষী আবু সালাম হত্যার সাথে জড়িত।
৩ ও ৪ নং স্বাক্ষী নিহত মতি মিয়ার ছেলে। ঘটনার সময় তাদের ফোনের সর্বশেষ নেটওয়ার্ক ছিল রাজধানীর কামরাঙ্গীচরে পাকাপুল এলাকায়। তারা মতি মিয়াকে হত্যা করা কি ভাবে দেখে স্বাক্ষী দিল?
এর মধ্যে ৫ নং স্বাক্ষী শাহ আলমও রাজধানীর কামরাঙ্গীচর থাকে।
একজন থাকে রাজধানীর পিরেরবাগ। কয়েকজন থাকে মিরপুর। এ বিষয়ে এলাকার স্থানীয় লোকজন অনুসন্ধানী টিমকে বলেন, শের জাহান মোমিনি, আয়ুব আলী ও আবু সালাম এলাকায় হত্যা, মাদককারবারিসহ নানা অপরাধ করে যাচ্ছে।
নিহত মতি মিয়ার স্ত্রী গোলবাহারের মুঠো ফোনে কথা বলতে চাইলে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি ফোনটি কেটে দেন।
মতি মিয়া হত্যাকান্ডে যে ১৩ জনকে স্বাক্ষী করা হয়ে তাদের মধ্যে ১১ জন ই ঘটনার সময় এলাকার বাইরে ছিল।
মতি মিয়ার সূরতহাল প্রতিবেদনে দেখা যায়, তার শরীরের ২ জায়গায় (গলাই ও মাথার পেছনে) আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। কিন্তু এজাহারে মতি মিয়ার স্ত্রী গোলবাহার উল্লেখ করেন তার স্বামীকে ১৭ জনে আঘাত করে হত্যা করেছে যেটা সম্পূর্ণ বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও মিথ্যা তথ্য। এ বিষয়ে মামলার ১ নং আসমী শাহ আলমের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, আমরা এ বিষয়ে কিছুই জানি না। মতি মিয়া একজন দিনমুজুর কৃষক ছিলেন। তাকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করে আমাদের ওপর মামলা দায়ের করছে। আমরা এর সুস্থ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত খুনিদেরকে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।
মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. লিয়াকত আলী জানান, নিহতের গলা কেটে এবং মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
























































