ব্যার্থতা ঢাকতে ব্যার্থ চেষ্টা
- আপডেট সময় : ১২:৪৭:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল ২০২৬
- / 38
ইরান যুদ্ধের এক চরম সংকটময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শত্রু সীমানার গভীরে ভূপাতিত এক মার্কিন বিমান সেনার জীবন যখন সুতোয় ঝুলছিল, তখন সেই সংকটকেই নিজের রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেন তিনি। ইস্টার উইকএন্ডে পরিচালিত এক দুর্ধর্ষ উদ্ধার অভিযানকে পুঁজি করে ট্রাম্প এখন চেষ্টা করছেন জনমনে যুদ্ধের নেতিবাচক ভাবমূর্তি মুছে দিয়ে নিজের শক্তিমত্তার জানান দিতে।
গত পাঁচ সপ্তাহ ধরে চলা এই ইরান যুদ্ধ মার্কিন ভোটারদের কাছে চরম অপ্রিয়। যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠলেও ট্রাম্পের গত সপ্তাহের অগোছালো ভাষণ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বিতর্কিত মন্তব্য সেই সংশয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। এমনকি ৭৯ বছর বয়সী প্রেসিডেন্টের মানসিক সুস্থতা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিলেন সমালোচকরা।
ঠিক এই সময়েই ওই বিমান সেনার উদ্ধার অভিযান ট্রাম্পের জন্য ‘লাইফলাইন’ হিসেবে কাজ করে। সোমবার হোয়াইট হাউসের ব্রিফিং রুমে হাজির হয়ে তিনি এই অভিযানকে কেবল একটি সামরিক সফলতা নয়, বরং একটি ‘ঐশ্বরিক বিজয়’ হিসেবে চিত্রায়িত করেন।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “আমাদের অবিশ্বাস্য প্রতিভাবান লোকজন রয়েছে। সময় এলে আমরা আকাশ-পাতাল এক করে হলেও তাদের নিরাপদে বাড়িতে ফিরিয়ে আনি। সৃষ্টিকর্তা আমাদের দিকে নজর রাখছিলেন।”
এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এটি ছিল দ্বিতীয়বার যখন প্রেসিডেন্ট সরাসরি জনগণের কাছে ইরানের বিষয়ে তাঁর বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য সময় নির্ধারণ করেন; যেখানে তিনি তাঁর নিজস্ব ‘ট্রাম্পীয়’ কায়দায় নিজের প্রেসিডেন্সির প্রধান প্রচারক এবং নির্বাহী প্রযোজকের ভূমিকা পালন করেন। গত সপ্তাহে একটি অগোছালো প্রাইম-টাইম ভাষনসহ নানা সময়ে তিনি এই বোমা হামলার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে হিমশিম খেয়েছেন। এমনকি ইস্টার রবিবারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর গালিগালাজপূর্ণ তিরস্কার প্রেসিডেন্টের যোগাযোগের স্বাভাবিক সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যা ৭৯ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্টের মানসিক সুস্থতা নিয়ে সাংবাদিকদের মনে প্রশ্নের উদ্রেক করে।
সোমবার জেমস এস. ব্র্যাডি প্রেস ব্রিফিং রুমের দৃশ্যটি ট্রাম্পের চিরচেনা রাজনৈতিক সহজাত প্রবৃত্তিরই বহিঃপ্রকাশ ছিল: একটি হাই-প্রোফাইল মুহূর্তকে নিজের শর্তে ব্যাখ্যা করা এবং যুদ্ধ-ক্লান্ত আমেরিকানদের সমর্থন আদায়ে এটিকে একটি ঐক্যবদ্ধ রণধ্বনি হিসেবে ব্যবহার করা।
তিনি একটি জটিল উদ্ধার অভিযানের বিস্তারিত বর্ণনা দেন, যেখানে তিনি নিজেও স্বীকার করেন যে ভাগ্যের সহায়তা ছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা, যারা সাধারণত অভ্যন্তরীণ আলোচনা নিয়ে কথা বলতে নারাজ, তারাও সপ্তাহান্তে সাংবাদিকদের এই অত্যাশ্চর্য অভিযানের প্রাণবন্ত বিবরণ লিখতে সহায়তা করেন।
ট্রাম্প একজন রক্তাত্ব অফিসারের বর্ণনা দেন যিনি ইরানে দুই দিন ধরে ধরা না দিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছিলেন। তিনি জানান, কীভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল পাহাড় বাইছে এবং ভেজা বালু থেকে বিমান উদ্ধারের চেষ্টা করছে, আবার শত্রু যেন ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য যন্ত্রপাতি ধ্বংস করে দিচ্ছে।
সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “শত শত মানুষ মারা যেতে পারত,” এবং উল্লেখ করেন যে কিছু সামরিক কর্মকর্তা তাঁকে এই অভিযানের বিরুদ্ধে পরামর্শ দিয়েছিলেন।
কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনকে ট্রাম্প জিজ্ঞেস করেন, “আপনি মোট কতজন লোক পাঠিয়েছিলেন?”
কেইন উত্তর দেন, “আমি ওটা গোপন রাখতে চাই।”
ট্রাম্প বলেন, “আমি এটা গোপন রাখব, কিন্তু এই অভিযানে শত শত লোক জড়িত ছিল।”
ভিড়ে ঠাসা কক্ষে সাংবাদিকরা আইল এবং প্রবেশপথ আটকে একে অপরের সাথে বাদানুবাদে লিপ্ত হচ্ছিলেন যাতে প্রেসিডেন্টের নজরে পড়া যায়। যদিও ট্রাম্প সামরিক বাহিনীর এই বীরত্বের বর্ণনা দিতে বেশ আনন্দ পাচ্ছিলেন—এমনকি সোমবারের আগের একটি অনুষ্ঠানে তিনি ইঙ্গিত দেন যে এই উদ্ধার অভিযান নিয়ে ভবিষ্যতে সিনেমা হতে পারে—তবুও তিনি একটি নামহীন সংবাদমাধ্যমের একজন সাংবাদিককে জেলে পাঠানোর হুমকি দেন। ওই সাংবাদিক দ্বিতীয় নিখোঁজ বিমান সেনাকে খুঁজে পাওয়ার আগেই প্রথম বিমান সেনার সফল উদ্ধারের খবরটি প্রকাশ করেছিলেন।
সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধের ব্যর্থতা আর অজনপ্রিয়তার দায় ঝেড়ে ফেলতে ট্রাম্প এখন ‘উদ্ধারকারী বীর’ ইমেজে ফিরতে মরিয়া। এই চাল তাঁকে কতটা রাজনৈতিক ফায়দা দেবে, তা সময়ই বলে দেবে।
























































