যে বাতাস লন্ডভন্ড করে দিতে পারে বিশাল জনপদ
- আপডেট সময় : ০৯:৪৮:০৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬
- / 47
পৃথিবীর বুকে প্রকৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী রূপগুলোর একটি হলো বাতাসের গতি। বাতাসের প্রচণ্ড ঝাপটা বা একটানা তীব্র প্রবাহ মুহূর্তের মধ্যে লন্ডভন্ড করে দিতে পারে বিশাল জনপদ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর ঠিক কোন স্থানে বা কোন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে তীব্র গতিতে বাতাস প্রবাহিত হয়?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য আবহাওয়াবিদরা বাতাসের গতির দুটি প্রধান ধরন বিবেচনা করেন-
১. দমকা হাওয়ার সর্বোচ্চ গতি এবং
২. দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী বাতাসের গড় গতি
বাতাসের তীব্রতা পরিমাপের এই দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করেই পৃথিবীর সবচেয়ে বায়ুবহুল বা শক্তিশালী বাতাসের অঞ্চলগুলো নির্ধারণ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, আমরা ওকলাহোমা (টর্নেডোর জন্য বিখ্যাত), অ্যান্টার্কটিকা (অতিরিক্ত শীতল ও তীব্র বাতাসের জন্য), দক্ষিণ মহাসাগর এবং অস্ট্রেলিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর কথা বিবেচনা করতে পারি।
বর্তমানে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত, পৃথিবীর বুকে রেকর্ডকৃত সর্বোচ্চ বাতাসের গতি হচ্ছে ঘণ্টায় ২৫৩ মাইল বা ৪০৮ কিলোমিটার। এটি একটি দমকা হাওয়ার গতিবেগ ছিল।
এই অবিশ্বাস্য রেকর্ডটি ধারণ করা হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ১০ এপ্রিল, অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত একটি ছোট্ট এবং জনহীন দ্বীপ ‘ব্যারো আইল্যান্ড’-এ। সেখানকার একটি স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া স্টেশনে এই রেকর্ডটি ধরা পড়ে।
ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় ‘অলিভিয়া’
এই সর্বোচ্চ রেকর্ডের পেছনে চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল একটি ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়, যার নাম ‘অলিভিয়া’।
আবহাওয়াবিদদের মতে, সাইক্লোন অলিভিয়া যদিও ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় হিসেবে পরিচিত নয়, কিন্তু এটি যে তীব্র দমকা হাওয়ার সৃষ্টি করেছিল, তা এখনও পর্যন্ত অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাতাসগুলো সাধারণত বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় থেকেই উৎপন্ন হয়। একটি ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াটি নিচে একটি রেখাচিত্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হলো:
যখন এই পরিস্থিতি প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হয়, তখন তাকে বলা হয় সাইক্লোন।
উত্তর সাগরে বা উত্তর-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে হলে তাকে বলা হয় টাইফুন, আর আটলান্টিক মহাসাগরে হলে তাকে হারিকেন বলা হয়। এগুলো নাম ভিন্ন হলেও মূলত একই ধরনের আবহাওয়াগত ঘটনা।
১৯৯৬ সালের আগে পর্যন্ত, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সবচেয়ে শক্তিশালী বাতাসের রেকর্ডটি ছিল ১৯৫১ সালের টাইফুন ন্যান্সি-এর দখলে। প্রশান্ত মহাসাগরে গঠিত এই টাইফুনটি যখন জাপানে আঘাত হানে, তখন এর গতিবেগ রেকর্ড করা হয়েছিল ঘণ্টায় ২১৫ মাইল (৩৪৬ কিলোমিটার)।
এই ভয়াবহ ঝড়ে জাপানে ১৭০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
তবে, আধুনিক যুগের আবহাওয়াবিদরা এখন সন্দেহ করেন যে ১৯৪০ থেকে ১৯৬০-এর দশকে ব্যবহৃত বাতাসের গতি পরিমাপের যন্ত্র বা পদ্ধতিগুলো কিছুটা ত্রুটিপূর্ণ ছিল এবং সেই সময়ে বাতাসের গতিকে কিছুটা অতিরঞ্জিত করে রেকর্ড করার প্রবণতা ছিল।
তাই, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বর্তমানে টাইফুন ন্যানসির রেকর্ডের চেয়ে সাইক্লোন অলিভিয়ার রেকর্ডকেই বেশি নির্ভরযোগ্য এবং নির্ভুল বলে মনে করে।
শুধু ঘূর্ণিঝড়ই নয়, পৃথিবীর কিছু অঞ্চল তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেও অত্যন্ত বায়ুবহুল।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যভাগ (টর্নেডো অ্যালি)
শক্তিশালী টর্নেডো বা টর্নেডোর উৎপত্তিস্থল হিসেবে এই অঞ্চলটি পৃথিবীতে সবচেয়ে কুখ্যাত। যদিও টর্নেডোর ভেতরের বাতাসের গতি পরিমাপ করা অত্যন্ত দুঃসাধ্য (কারণ বাতাসের গতি মাপার যন্ত্র টর্নেডোর তীব্রতায় সাধারণত নষ্ট হয়ে যায়), তবুও ধারণা করা হয়, একটি শক্তিশালী টর্নেডোর পেছনের বাতাসের গতি সাইক্লোন অলিভিয়ার রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। কিছু রাডার পরিমাপে ওকলাহোমার টর্নেডোতে ঘণ্টায় ৩০০ মাইলেরও (৪৮০ কিমি) বেশি গতিবেগ ধরা পড়েছে, কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এগুলোকে এখনও সরাসরি অফিসিয়াল রেকর্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।
অ্যান্টার্কটিকা
এই শীতল মহাদেশটি তার তীব্র এবং স্থায়ী ‘কাতাবাটিক’ বাতাসের জন্য পরিচিত। এখানকার ঠান্ডা, ঘন বাতাস মহাদেশের উঁচু মালভূমি থেকে দ্রুতগতিতে উপকূলের দিকে নেমে আসে, যা সারাবছরই অত্যন্ত শক্তিশালী বায়ুবহুল পরিবেশ তৈরি করে।
দক্ষিণ মহাসাগর
পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধের এই মহাসাগরে বাতাসের প্রবাহকে বাধা দেওয়ার মতো কোনো বড় ভূখণ্ড নেই। এই কারণে এখানে সারাবছরই অত্যন্ত শক্তিশালী এবং অবাধে বাতাস প্রবাহিত হয়, যা সমুদ্রকে সর্বদা উত্তাল রাখে।
পরিশেষে বলা যায়, পৃথিবীতে বাতাসের গতি একটি পরিবর্তনশীল এবং বিধ্বংসী প্রাকৃতিক ঘটনা। যদিও ওকলাহোমার টর্নেডো বা অ্যান্টার্কটিকার স্থায়ী বাতাস অত্যন্ত শক্তিশালী, তবুও এখন পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক উপায়ে যন্ত্রের মাধ্যমে রেকর্ডকৃত পৃথিবীর সর্বোচ্চ বাতাসের গতিবেগ হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার ব্যারো আইল্যান্ডে সাইক্লোন অলিভিয়া কর্তৃক সৃষ্ট ঘণ্টায় ২৫৩ মাইল বা ৪০৮ কিলোমিটারের দমকা হাওয়া।





























































