লালমাই পাহাড়ের সিলগালা করা তেলকূপ নিয়ে মিথ্যা বনাম বাস্তবতা
- আপডেট সময় : ০৬:০৫:১৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬
- / 54
লালমাই পাহাড়ের সিলগালা করা তেলকূপ নিয়ে মিথ্যা বনাম বাস্তবতা
কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার বড় ধর্মপুর এলাকার লালমাই পাহাড়কে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে একটি রোমাঞ্চকর গুঞ্জনের ডালপালা মেলেছে। স্থানীয়দের মুখে মুখে ফেরে—এখানে তেলের খনি পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু এক ‘অদৃশ্য হেলিকপ্টার’ এসে রাতারাতি তা সিলগালা করে দিয়ে যায়। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই রহস্যময় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আবারও তুমুল কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে।
জনশ্রুতি ও স্থানীয়দের ভাষ্য
এলাকাবাসীর দাবি, ২০০২ সালের দিকে বিদেশি কোম্পানি এখানে বিশাল যজ্ঞ শুরু করেছিল। হাজার হাজার ফুট গভীরে খননকাজ চালানো হয়। স্থানীয় বাসিন্দা মো. সিরাজের মতে, “আমরা নিজের চোখে তেল উঠতে দেখেছি। কিন্তু হুট করেই কোরিয়ান কোম্পানি কাজ বন্ধ করে চলে যায় এবং হেলিকপ্টারে করে এসে কূপটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।”
আরেক বাসিন্দা মো. শহীদের কন্ঠেও একই সুর, “ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি সিসা ঢালাই দিয়ে মুখ বন্ধ করা হয়েছে। সরকার চাইলে এখানে আবারও নতুন করে অনুসন্ধান চালাতে পারে।”
প্রকৃত অনুসন্ধান ও বাপেক্সের তথ্য
আবেগের জায়গা সরিয়ে রেখে কারিগরি তথ্যের দিকে তাকালে ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়
অনুসন্ধান কাল: ২০১৭-১৮ সালের দিকে বাপেক্স (BAPEX) লালমাই এলাকায় ব্যাপক অনুসন্ধান চালায়।
কূপের সংখ্যা: সে সময় ‘লালমাই-১’ ও ‘লালমাই-২’ নামে দুটি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়।
প্রাপ্তি: লালমাই-১ কূপে তেলের অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও তার পরিমাণ ছিল যৎসামান্য। দৈনিক মাত্র ২০ থেকে ২৫ ব্যারেল তেল পাওয়া যাচ্ছিল।
কেন বন্ধ করা হলো এই প্রকল্প?
জ্বালানি খাতে কোনো তেলকূপকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হতে হলে দৈনিক অন্তত কয়েকশ ব্যারেল তেল উত্তোলন প্রয়োজন। লালমাইয়ের ক্ষেত্রে প্রধান বাধাগুলো ছিল স্বল্প উৎপাদন, উত্তোলনের পরিমাণ ছিল প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।
কারিগরি জটিলতা:
তেলের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে পানি উঠে আসা এবং ভূগর্ভস্থ চাপ দ্রুত কমে যাওয়া।
অলাভজনক বিনিয়োগ: উত্তোলনের ব্যয়ের তুলনায় তেলের বাজারমূল্য কম হওয়ায় প্রকল্পটি চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কূপ অলাভজনক প্রমাণিত হলে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকি (যেমন: গ্যাস লিক বা অগ্নিকাণ্ড) এড়াতে তা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাকে কারিগরি ভাষায় ‘প্লাগ অ্যান্ড অ্যাবানডন’ বলা হয়।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত:
পেট্রোবাংলার উপ-ব্যবস্থাপক সৈকত মাহমুদ স্পষ্ট জানিয়েছেন, লালমাই এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক কোনো মজুত না মেলায় নিয়ম মেনেই কূপগুলো বন্ধ করা হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলগালা করা বা সিসা ঢালাই দেওয়ার বিষয়টি কোনো ষড়যন্ত্র নয়, বরং পরিবেশ ও ভূগর্ভস্থ পানি দূষণমুক্ত রাখার একটি প্রমিত বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।
মূল কথাঃ লালমাই পাহাড়ে তেলের উপস্থিতি ছিল সত্য, কিন্তু তা দেশের বিশাল চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত ছিল না।
হেলিকপ্টার বা অদৃশ্য শক্তির গল্পের চেয়ে ভূতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতাই এই কূপগুলো বন্ধ হওয়ার আসল কারণ। তবে ভবিষ্যতের উন্নত প্রযুক্তি হয়তো কোনোদিন এই পাহাড়ের বুক থেকে নতুন কোনো খনিজ সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।



































