ঢাকা ০২:০৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ৩০ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ফিদিয়া কী ?

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:০০:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬
  • / 9
দেশবর্ণ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

রমজান মাস মুসলমানদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এই মাসে রোজা রাখা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মুসলমানের ওপর ফরজ। কিন্তু ইসলাম একটি সহজ ও বাস্তবসম্মত জীবনব্যবস্থা। আল্লাহ তায়ালা কারও ওপর তার সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেন না। তাই যারা বার্ধক্য বা গুরুতর অসুস্থতার কারণে রোজা রাখতে একেবারেই অক্ষম, ইসলাম তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রেখেছে, যাকে ‘ফিদিয়া’ বলা হয়।

রোজার ফিদিয়া আদায়ের নিয়ম, পরিমাণ এবং এটি কাদের জন্য প্রযোজ্য—তা নিয়ে বিস্তারিত এই ফিচারটি সাজানো হয়েছে।

ফিদিয়া কী?

‘ফিদিয়া’ শব্দের অর্থ হলো ক্ষতিপূরণ বা মুক্তিপণ। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায়, কোনো ব্যক্তি যদি এমন কোনো কারণে রোজা রাখতে অক্ষম হন যার কারণে ভবিষ্যতে রোজা কাজা করারও কোনো সম্ভাবনা নেই, তখন প্রতিটি রোজার পরিবর্তে একজন গরিবকে খাবার খাওয়ানো বা সমপরিমাণ অর্থ দান করাকে ফিদিয়া বলা হয়।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“আর যাদের জন্য রোজা রাখা অত্যন্ত কষ্টদায়ক, তারা এর পরিবর্তে ফিদিয়া দেবে—একজন মিসকিনকে খাবার খাওয়াবে।” (সূরা বাকারাহ: ১৮৪)

ফিদিয়া কাদের জন্য প্রযোজ্য?

ফিদিয়া সবার জন্য নয়। কেবল দুটি শ্রেণির মানুষের জন্য ফিদিয়া দেওয়ার বিধান রয়েছে:

১. অতিশয় বৃদ্ধ (শায়েখে ফানি): এমন বৃদ্ধ ব্যক্তি, যার শারীরিক শক্তি এতটাই কমে গেছে যে রোজা রাখার সামর্থ্য নেই এবং ভবিষ্যতে আবার সামর্থ্য ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই।

২. চিরস্থায়ী অসুস্থ ব্যক্তি: এমন অসুস্থ ব্যক্তি, যার রোগমুক্তির কোনো আশা নেই এবং রোজা রাখলে তার জীবন বিপন্ন হতে পারে বা রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।

সতর্কতা: গর্ভবতী নারী, স্তন্যদানকারী মা, মুসাফির (ভ্রমণকারী) বা সাময়িকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য ফিদিয়া প্রযোজ্য নয়। তাদের সুস্থ হওয়ার পর বা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রোজার ‘কাজা’ (পরবর্তীতে রোজা রাখা) আদায় করতে হবে।

ফিদিয়ার পরিমাণ কত?

প্রতিটি রোজার জন্য ফিদিয়ার পরিমাণ হলো ‘সাদাকাতুল ফিতর’ বা ফিতরার সমান।

খাবারের মাপে: একজন মিসকিনকে (অভাবী মানুষকে) এক দিনের দুই বেলা পেটপুরে তৃপ্তিসহকারে খাবার খাওয়ানো। অথবা আধা সা’ (প্রায় ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম) গম বা আটা, কিংবা এক সা’ (প্রায় ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম) খেজুর, যব বা কিসমিস দান করা।

অর্থের মাপে: বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতি বছর ফিতরার যে পরিমাণ নির্ধারণ করে দেয়, প্রতিটি রোজার জন্য সমপরিমাণ অর্থ ফিদিয়া হিসেবে আদায় করতে হবে। (যেমন— ফিতরা যদি ১১৫ টাকা হয়, তবে ৩০ রোজার ফিদিয়া হবে ১১৫ x ৩০ = ৩৪৫০ টাকা)।

ফিদিয়া আদায়ের নিয়ম ও সময়

১. কখন দেবেন: রমজান মাস শুরু হলে ফিদিয়া দেওয়া যায়। কেউ চাইলে প্রতিদিন একটি রোজার ফিদিয়া প্রতিদিন দিতে পারেন, আবার চাইলে রমজানের শুরুতেও পুরো মাসের ফিদিয়া একবারে দিয়ে দিতে পারেন। তবে রমজান মাস আসার আগে অগ্রিম ফিদিয়া দেওয়া যাবে না।

২. কাকে দেবেন: ফিদিয়া কেবল গরিব, মিসকিন এবং জাকাত পাওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিদেরই দেওয়া যাবে। মসজিদ, মাদ্রাসা বা কোনো সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে ফিদিয়ার টাকা দেওয়া যাবে না। তবে মাদ্রাসার গরিব ফান্ডে দেওয়া যাবে।

৩. কীভাবে দেবেন: ৩০ রোজার ফিদিয়া চাইলে একজন গরিব মানুষকেও দেওয়া যায়, আবার ৩০ জন ভিন্ন ভিন্ন মানুষকেও দেওয়া যায়। এতে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

সুস্থ হয়ে গেলে বা সামর্থ্য ফিরে পেলে করণীয়

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাসআলা। যদি কোনো ব্যক্তি রোগমুক্তির আশা ছেড়ে দিয়ে ফিদিয়া আদায় করে ফেলেন, কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহর রহমতে তিনি সুস্থ হয়ে যান এবং রোজা রাখার সামর্থ্য ফিরে পান, তবে তার পূর্বের আদায় করা ফিদিয়াগুলো ‘নফল দান’ হিসেবে গণ্য হবে। সুস্থ হওয়ার পর তাকে অবশ্যই ছুটে যাওয়া রোজাগুলো কাজা করতে হবে।

ফিদিয়া দেওয়ার সামর্থ্য না থাকলে কী করবেন?

এমন কোনো বৃদ্ধ বা চিরস্থায়ী অসুস্থ ব্যক্তি যদি থাকেন, যিনি রোজা রাখতেও অক্ষম আবার তার ফিদিয়া দেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্যও নেই, তবে ইসলাম তাকেও নিরাশ করেনি। এমন ব্যক্তির জন্য করণীয় হলো, আল্লাহর কাছে বেশি বেশি ইস্তেগফার বা ক্ষমাপ্রার্থনা করা। আল্লাহ দয়ালু, তিনি আন্তরিক অপারগতা ক্ষমা করে দেন। তবে পরবর্তীতে কখনো আর্থিক সচ্ছলতা আসলে তাকে ফিদিয়া আদায় করে দিতে হবে।

ইসলামী শরিয়ত মানুষের জন্য কোনো কষ্টকর নিয়ম চাপিয়ে দেয়নি। রোজা রাখার মতো মহান ইবাদত থেকে যারা শারীরিক কারণে বঞ্চিত হচ্ছেন, ফিদিয়ার মাধ্যমে তারা সেই ইবাদতের সওয়াব লাভের সুযোগ পাচ্ছেন এবং এর মাধ্যমে সমাজের গরিব ও অসহায় মানুষেরও খাদ্যের ব্যবস্থা হচ্ছে। তাই যাদের ওপর ফিদিয়া ওয়াজিব, তাদের উচিত সঠিক নিয়মে ও দ্রুত তা আদায় করা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ফিদিয়া কী ?

আপডেট সময় : ০৮:০০:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬

রমজান মাস মুসলমানদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এই মাসে রোজা রাখা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মুসলমানের ওপর ফরজ। কিন্তু ইসলাম একটি সহজ ও বাস্তবসম্মত জীবনব্যবস্থা। আল্লাহ তায়ালা কারও ওপর তার সাধ্যাতীত বোঝা চাপিয়ে দেন না। তাই যারা বার্ধক্য বা গুরুতর অসুস্থতার কারণে রোজা রাখতে একেবারেই অক্ষম, ইসলাম তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রেখেছে, যাকে ‘ফিদিয়া’ বলা হয়।

রোজার ফিদিয়া আদায়ের নিয়ম, পরিমাণ এবং এটি কাদের জন্য প্রযোজ্য—তা নিয়ে বিস্তারিত এই ফিচারটি সাজানো হয়েছে।

ফিদিয়া কী?

‘ফিদিয়া’ শব্দের অর্থ হলো ক্ষতিপূরণ বা মুক্তিপণ। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায়, কোনো ব্যক্তি যদি এমন কোনো কারণে রোজা রাখতে অক্ষম হন যার কারণে ভবিষ্যতে রোজা কাজা করারও কোনো সম্ভাবনা নেই, তখন প্রতিটি রোজার পরিবর্তে একজন গরিবকে খাবার খাওয়ানো বা সমপরিমাণ অর্থ দান করাকে ফিদিয়া বলা হয়।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“আর যাদের জন্য রোজা রাখা অত্যন্ত কষ্টদায়ক, তারা এর পরিবর্তে ফিদিয়া দেবে—একজন মিসকিনকে খাবার খাওয়াবে।” (সূরা বাকারাহ: ১৮৪)

ফিদিয়া কাদের জন্য প্রযোজ্য?

ফিদিয়া সবার জন্য নয়। কেবল দুটি শ্রেণির মানুষের জন্য ফিদিয়া দেওয়ার বিধান রয়েছে:

১. অতিশয় বৃদ্ধ (শায়েখে ফানি): এমন বৃদ্ধ ব্যক্তি, যার শারীরিক শক্তি এতটাই কমে গেছে যে রোজা রাখার সামর্থ্য নেই এবং ভবিষ্যতে আবার সামর্থ্য ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই।

২. চিরস্থায়ী অসুস্থ ব্যক্তি: এমন অসুস্থ ব্যক্তি, যার রোগমুক্তির কোনো আশা নেই এবং রোজা রাখলে তার জীবন বিপন্ন হতে পারে বা রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।

সতর্কতা: গর্ভবতী নারী, স্তন্যদানকারী মা, মুসাফির (ভ্রমণকারী) বা সাময়িকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য ফিদিয়া প্রযোজ্য নয়। তাদের সুস্থ হওয়ার পর বা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রোজার ‘কাজা’ (পরবর্তীতে রোজা রাখা) আদায় করতে হবে।

ফিদিয়ার পরিমাণ কত?

প্রতিটি রোজার জন্য ফিদিয়ার পরিমাণ হলো ‘সাদাকাতুল ফিতর’ বা ফিতরার সমান।

খাবারের মাপে: একজন মিসকিনকে (অভাবী মানুষকে) এক দিনের দুই বেলা পেটপুরে তৃপ্তিসহকারে খাবার খাওয়ানো। অথবা আধা সা’ (প্রায় ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম) গম বা আটা, কিংবা এক সা’ (প্রায় ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম) খেজুর, যব বা কিসমিস দান করা।

অর্থের মাপে: বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতি বছর ফিতরার যে পরিমাণ নির্ধারণ করে দেয়, প্রতিটি রোজার জন্য সমপরিমাণ অর্থ ফিদিয়া হিসেবে আদায় করতে হবে। (যেমন— ফিতরা যদি ১১৫ টাকা হয়, তবে ৩০ রোজার ফিদিয়া হবে ১১৫ x ৩০ = ৩৪৫০ টাকা)।

ফিদিয়া আদায়ের নিয়ম ও সময়

১. কখন দেবেন: রমজান মাস শুরু হলে ফিদিয়া দেওয়া যায়। কেউ চাইলে প্রতিদিন একটি রোজার ফিদিয়া প্রতিদিন দিতে পারেন, আবার চাইলে রমজানের শুরুতেও পুরো মাসের ফিদিয়া একবারে দিয়ে দিতে পারেন। তবে রমজান মাস আসার আগে অগ্রিম ফিদিয়া দেওয়া যাবে না।

২. কাকে দেবেন: ফিদিয়া কেবল গরিব, মিসকিন এবং জাকাত পাওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিদেরই দেওয়া যাবে। মসজিদ, মাদ্রাসা বা কোনো সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে ফিদিয়ার টাকা দেওয়া যাবে না। তবে মাদ্রাসার গরিব ফান্ডে দেওয়া যাবে।

৩. কীভাবে দেবেন: ৩০ রোজার ফিদিয়া চাইলে একজন গরিব মানুষকেও দেওয়া যায়, আবার ৩০ জন ভিন্ন ভিন্ন মানুষকেও দেওয়া যায়। এতে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

সুস্থ হয়ে গেলে বা সামর্থ্য ফিরে পেলে করণীয়

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাসআলা। যদি কোনো ব্যক্তি রোগমুক্তির আশা ছেড়ে দিয়ে ফিদিয়া আদায় করে ফেলেন, কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহর রহমতে তিনি সুস্থ হয়ে যান এবং রোজা রাখার সামর্থ্য ফিরে পান, তবে তার পূর্বের আদায় করা ফিদিয়াগুলো ‘নফল দান’ হিসেবে গণ্য হবে। সুস্থ হওয়ার পর তাকে অবশ্যই ছুটে যাওয়া রোজাগুলো কাজা করতে হবে।

ফিদিয়া দেওয়ার সামর্থ্য না থাকলে কী করবেন?

এমন কোনো বৃদ্ধ বা চিরস্থায়ী অসুস্থ ব্যক্তি যদি থাকেন, যিনি রোজা রাখতেও অক্ষম আবার তার ফিদিয়া দেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্যও নেই, তবে ইসলাম তাকেও নিরাশ করেনি। এমন ব্যক্তির জন্য করণীয় হলো, আল্লাহর কাছে বেশি বেশি ইস্তেগফার বা ক্ষমাপ্রার্থনা করা। আল্লাহ দয়ালু, তিনি আন্তরিক অপারগতা ক্ষমা করে দেন। তবে পরবর্তীতে কখনো আর্থিক সচ্ছলতা আসলে তাকে ফিদিয়া আদায় করে দিতে হবে।

ইসলামী শরিয়ত মানুষের জন্য কোনো কষ্টকর নিয়ম চাপিয়ে দেয়নি। রোজা রাখার মতো মহান ইবাদত থেকে যারা শারীরিক কারণে বঞ্চিত হচ্ছেন, ফিদিয়ার মাধ্যমে তারা সেই ইবাদতের সওয়াব লাভের সুযোগ পাচ্ছেন এবং এর মাধ্যমে সমাজের গরিব ও অসহায় মানুষেরও খাদ্যের ব্যবস্থা হচ্ছে। তাই যাদের ওপর ফিদিয়া ওয়াজিব, তাদের উচিত সঠিক নিয়মে ও দ্রুত তা আদায় করা।