বাংলা সন কাদের
- আপডেট সময় : ০৯:২৫:১৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬
- / 3
|| জহির উদ্দিন বাবর ||
‘আজ বাংলা মাসের কত তারিখ’ এই প্রশ্নটি করলে বেশির ভাগ লোক সাধারণত উত্তর দিতে পারে না। অনেকে তারিখ বলতে পারলেও এখন বাংলা কত সাল চলছে সেটা বলতে পারে না। তবে সারা বছর তেমন গণনা না করা হলেও বাংলা সনের প্রথম দিনটি পালন করা হয় অনেক ধুমধামে। পয়লা বৈশাখ এখন আমাদের জাতীয় জীবনের অন্যতম উৎসবের দিন। দিন দিন পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে উৎসবের মাত্রা বাড়ছে। এখন বাংলা বছরের প্রথম দিনটি কেন্দ্র করে মানুষ যত মাতামাতি করে তা একসময় করতো না। এখনকার এই মাতামাতির পেছনে মূল ভূমিকা মিডিয়ার। টেলিভিশন, রেডিও এবং আমাদের সংবাদপত্রগুলো মানুষকে পয়লা বৈশাখের আনুষ্ঠানিকতার প্রতি উসকে দিচ্ছে।
এখন পয়লা বৈশাখ মানেই মহা-উৎসবের দিন। রমনার বটমূল থেকে শুরু করে রাজধানীজুড়ে এদিন মানুষের ঢল নামে। আগে শুধু রমনা এলাকায় পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান হলেও এখন পুরো রাজধানীতেই চলে এই অনুষ্ঠান। এদিন রাস্তায় বের হওয়া মানেই অন্তহীন দুর্ভোগ। তবু ঢাকা শহরের বেশির ভাগ মানুষ এদিন বেরিয়ে আসে। ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ কেউ আর এদিন ঘরে থাকতে চায় না। পয়লা বৈশাখকেন্দ্রিক সংস্কৃতিতেও এখন এসেছে পরিবর্তন। আগে সাদামাটা বাঙালিয়ানা আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল পয়লা বৈশাখ; কিন্তু এখন এতে যুক্ত হয়েছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর নানা স্পন্সর ও প্রণোদনা। তারা মিডিয়ার মাধ্যমে জনসাধারণকে এই দিবসে মাতোয়ারা হতে নানাভাবে উৎসাহিত করে। এই দিনকে কেন্দ্র করে গান-বাজনার নানা আয়োজন করে। দিনটিকে কেন্দ্র করে চলে নানা অশ্লীলতার মহড়াও।
পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর প্রথা চলে আসছে বহুকাল ধরে। বাংলা সনের শেষ দিন অর্থাৎ ৩১ চৈত্র আবহমান কাল থেকে হালখাতা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এদিন ব্যবসায়ীরা তাদের নিয়মিত ক্রেতাদের দাওয়াত করে মিষ্টিমুখ করান। এ উপলক্ষে যাদের কাছে বাকি আছে তারা তা পরিশোধ করেন। এতে ব্যবসায়ীরা বেশ লাভবান হন। তবে এখন আর সেই রেওয়াজ খুব একটা নেই। এখন আর ব্যবসায়ীদের ‘শুভ হালখাতা’ পালন করতে তেমন দেখা যায় না।
আগে পয়লা বৈশাকে গ্রাম-বাংলায় বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হতো। সেই মেলায় নানা ধরনের পণ্য উঠত। কৃষক পরিবারগুলো সারা বছর অপেক্ষায় থাকত সেই মেলার। সেদিন মিষ্টি-বাতাসা, খই-মুড়ি, মোয়া-খাজা আরও কত কী খাবার কিনে সবাইকে নিয়ে ধুমধামে খেতেন। ঘরে ঘরে বিরাজ করতো উৎসবের আমেজ। শিশুরা মেলায় গিয়ে নাগরদোলায় চড়ত, পুতুল নাচ আর সাপ খেলা দেখে আনন্দ ভোগ করত! কিন্তু এখন আর সেই মেলা নেই। থাকলেও পাল্টে গেছে মেলার রূপ। সবকিছুতে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। এখনকার মেলাগুলো হয়ত আগের চেয়ে আরও বেশি ঝাঁকঝমকপূর্ণ হয়েছে, কিন্তু আগের সেই প্রাণ নেই। শহুরে সংস্কৃতির থাবা গ্রাম্য সেই নির্মল সংস্কৃতিকে ম্লান করে দিয়েছে।
দুই.
দিন-তারিখ গণনার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ইংরেজি সন। আমরা দৈনন্দিন কাজকর্মে সাধারণত ইংরেজি সনটাকেই বেশি গুরুত্ব দিই। এর বাইরে কিছু কিছু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার ক্ষেত্রে আরবি বা হিজরি সনের গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে রমজান, ঈদ, কুরবানি, হজ এসব ইবাদতের ক্ষেত্রে আরবি মাস গুরুত্বের সঙ্গে গণনা করা হয়। তবে এক্ষেত্রে অনেকটা উপেক্ষিত বাংলা সন। খুব কম লোকই বাংলা সনের হিসাব রাখেন। অথচ এই সনটিও আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বিশেষ করে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের সঙ্গে বাংলা সনের সম্পর্ক অনেক বেশি গাঢ়।
বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন কেন মুসলিম সংস্কৃতির অংশ সেটা বোঝা যাবে এর উৎপত্তির ইতিহাসটি জানলে। আমরা জানি বাংলা সনের প্রবর্তক সম্রাট আকবর। মুঘল শাসকদের মধ্যে তিনি ছিলেন খুবই প্রভাবশালী। সংস্কারমূলক বেশ কিছু কাজ তিনি করেছেন। যদিও তাকে নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। ‘দীন-ই ইলাহি’ নামে নতুন ধর্মের প্রবর্তন করতে গিয়ে ধিকৃত হয়েছেন। সেই সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন সময়ের প্রয়োজনেই। তখন প্রজাদের কাছ থেকে আদায় করা খাজনা দিয়েই চলত শাসনকাজ। আর প্রজাদের বেশির ভাগই ছিলেন কৃষক। তাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করা হতো চন্দ্রবর্ষ বা আরবি মাসের হিসাবে। কিন্তু এতে দেখা দিলো সমস্যা। কারণ আরবি মাস এক জায়গায় স্থির থাকে না। প্রতি বছর প্রায় ১০ দিন এগিয়ে আসে। এতে কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করতে সমস্যা দেখা দিলো। কারণ ফসল উৎপন্ন হয় সৌরবর্ষ অনুসারে।
এই সমস্যার মুখোমুখি হয়ে বাদশা আকবর তার দরবারের পণ্ডিতদের ডাকলেন। তাদের কাছে এই সমস্যার সমাধানে কী করা যায় এ ব্যাপারে পরামর্শ চাইলেন। অনেক শলা-পরামর্শের পর বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জোতির্বিদ আমীর ফতুল্লাহ সিরাজীকে নতুন একটি বর্ষপঞ্জি তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হলো। তার প্রচেষ্টায় হিজরি ৯৬৩ সালের মহররম মাসের শুরু থেকে বাংলা নববর্ষের সূচনা হয়। মজার ব্যাপার হলো, বাংলা সন শুরু হয় হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে। ফলে জন্মদিনেই বঙ্গাব্দের বয়স দাঁড়ায় ৯৬৩ বছর। শুরুর বছর যেহেতু মহররম মাসের সঙ্গে বৈশাখ মাসের মিল ছিল তাই এই মাসকেই প্রথম মাস ধরে গণনা শুরু হয়।
রাসুলুল্লাহ সা.-এর হিজরতের তারিখ থেকে হিজরি সন গণনা শুরু হয়। দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর রা. হিজরি বর্ষ গণনার প্রচলন শুরু করেন। কালক্রমে হিজরি সন মুসলিম ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে গেছে। যেহেতু হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে বাংলা সনের উৎপত্তি সুতরাং বঙ্গাব্দও মুসলিম সংস্কৃতিরই অংশ। হিজরি মুসলমানদের সন হলেও বঙ্গাব্দও তাদের।
তিন.
বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন মুসলিম সংস্কৃতির অংশ-এটা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত হলেও তা উদযাপনে মুসলিম সংস্কৃতি চরমভাবে উপেক্ষিত। আজকাল বাংলা সনকে তথাকথিত বাঙালি সংস্কৃতির অংশ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আর বাঙালি সংস্কৃতি বলে পরোক্ষভাবে হিন্দুয়ানি সংস্কৃতিকেই প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে। এজন্য পয়লা বৈশাখ পালনের যে সংস্কৃতি দিন দিন বিস্তৃতি লাভ করছে সেখানে স্পষ্টভাবে হিন্দুদের ধর্মীয় সংস্কৃতির ছাপ ফুটে ওঠে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে যে শোভাযাত্রা বের করা হয় এটি নাকি আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যের অংশ। অথচ এই মিছিলে হিন্দুদের মূর্তি-সংস্কৃতি ফুটে উঠে স্পষ্টরূপে। নারী-পুরুষের সম্মিলিত শোভাযাত্রায় পেঁচার অবয়ব ধারণ করে মঙ্গল কামনা করা হয়। অথচ পেঁচাকে অমঙ্গলের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। রমনা বটমূলে চলে নারী-পুরুষের অবাধ নাচ-গান, আড্ডা। আর পান্তা-ইলিশ নামে শহুরে যে সংস্কৃতি চালু আছে তা কোনোভাবেই আমাদের মুসলিম সংস্কৃতির জন্য সহায়ক নয়।
বছরের প্রথম দিনটি আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে বরণ করার মধ্যে দোষের তেমন কিছু নেই। নতুন বছরে সবকিছু নতুন উদ্যমে শুরু করার একটা প্রত্যয় থাকে সবার ভেতর। আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে সেই প্রত্যয়ে গতি সঞ্চার হয়। কিন্তু সেই আনুষ্ঠানিকতা যদি কারও বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তাহলে সেই আনুষ্ঠানিকতা কোনো উপকারে আসে না। পয়লা বৈশাখের সঙ্গে দিন দিন যেভাবে ক্ষতিকর অনুসঙ্গ যুক্ত হচ্ছে তা আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জন্য অশনিসংকেত। এজন্য আমাদের উচিত, পয়লা বৈশাখকেন্দ্রিক ক্ষতিকর আনুষ্ঠানিকতা থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখা।
লেখক: আলেম লেখক, সাংবাদিক ও সম্পাদক



























































